একুয়া হ্যাগন
প্রকাশ: ০২:০৫, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০৪:৪২, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
কেউ আমাদের কিছু বলল, আর অমনি আমাদের বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে গেল ! কেউ কিছু একটা করল, আর সাথে সাথেই আমরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ বা আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম ! কেউ আমাদের দিকে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাকাল যে আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়লাম ! কোনো অমীমাংসিত সমস্যা বা অতীতের কোনো আঘাতের সাথে যুক্ত কোনো ব্যক্তি, স্থান বা বস্তুর উল্লেখ শুনলেই আমরা তাৎক্ষণিকভাবে দুঃখ, রাগ, ভয় বা অপমানে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাই।
যখনই এমন কিছু ঘটে, তখনই নিশ্চিত হতে পারেন যে আমাদের ভেতরে একটি 'ট্রিগার' কাজ করেছে। এটি একটি উদ্দীপক-প্রতিক্রিয়া অভিজ্ঞতা যা আমাদের সবার সাথেই ঘটে। এই উদ্দীপকটিকে রূপক অর্থে 'ট্রিগার' বা 'বাটন' বলা হয়। যেমন— "তার কথাটি আমাকে ট্রিগার করেছে" অথবা "সে আমার বাটন টিপে দিয়েছে" (অর্থাৎ আমাকে খেপিয়ে তুলেছে)।
একটি ট্রিগার হতে পারে যেকোনো শব্দ, ব্যক্তি, ঘটনা বা অভিজ্ঞতা যা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের মনে কোনো আবেগীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যেমন— বিষণ্ণতা, রাগ, ভয়, আতঙ্ক বা অপমান। কিছু কথা, আচরণ বা এমনকি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি আমাদের ভেতরে এমন রিফ্লেক্স তৈরি করতে পারে যার ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। যেমন— হঠাৎ কোনো শব্দে আমরা চমকে উঠি। এখানে শব্দটি হলো 'ট্রিগার' এবং চমকে ওঠা হলো 'প্রতিক্রিয়া'। এই প্রতিক্রিয়া কখনো ক্ষণস্থায়ী হয়, আবার কখনো এটি আচ্ছন্নতায় পরিণত হয় যা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি আমাদের মানসিক শক্তি কেড়ে নেয় এবং আমাদের মধ্যে অনিরাপত্তাবোধ তৈরি করে।
‘ট্রিগার’ হলো উন্নতির সংকেত
ট্রিগারের প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া প্রায়ই মাত্রাতিরিক্ত হয়— অর্থাৎ, ঘটনার গুরুত্বের তুলনায় আমাদের প্রতিক্রিয়া অনেক বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়। একটি ট্রিগার আমাদের কতটা প্রভাবিত করবে তা নির্ভর করে আমরা মানসিকভাবে কতটা সংবেদনশীল তার ওপর। অন্যদের আচরণের প্রতি আমরা যত বেশি সংবেদনশীল হব, আমাদের ভয়, রাগ বা লজ্জা তত তীব্রভাবে ফেটে পড়বে। আমরা যখন মানসিকভাবে শক্তিশালী এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি, তখন অন্যদের তীরের মতো কথাগুলো আমাদের অতটা গভীরে বিঁধতে পারে না।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে, পৃথিবী এবং এর নেতিবাচক দিকগুলো থেকে লুকিয়ে না থেকে বরং তা মোকাবিলা করার জন্য আমাদের মানসিকভাবে যথেষ্ট দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন। তখন আমরা সাহসের সাথে এই পরিস্থিতিগুলো সামলাতে এবং নিজেকে সারিয়ে তুলতে পারব। কেন আমরা ট্রিগার্ড হচ্ছি তা বুঝতে পারাটাই হলো নিজের নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পথ।
যদি কোনো ট্রিগারের রেশ দীর্ঘ সময় ধরে আপনার মধ্যে থেকে যায়; যেমন— অফিসের কোনো ঘটনায় আপনি রাতে ঘুমাতে পারছেন না, তবে সেটি একটি সংকেত। এর মানে হলো সেখানে খতিয়ে দেখার মতো কিছু একটা আছে। এটি আমাদের ইঙ্গিত দেয় যে পরিস্থিতি সামলাতে আমাদের হয়তো কারও সাথে কথা বলা বা নিজের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো প্রয়োজন। এভাবে একটি ট্রিগার আমাদের সুস্থ আত্মমর্যাদাবোধের দিকে আহ্বান জানাতে পারে।
মস্তিষ্ক এবং বিশ্বাস কীভাবে আমাদের প্রতিক্রিয়া গঠন করে
আমাদের প্রতিক্রিয়া নির্ভর করে আমরা ট্রিগারটিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি বা সে সম্পর্কে আমাদের 'বিশ্বাস' কেমন তার ওপর। এই বিশ্বাসগুলো হতে পারে কোনো ধারণা, ভুল ধারণা বা অনুমান। প্রক্রিয়াটি বিশ্বাস থেকে শুরু হয়ে অনুভূতির মাধ্যমে অভিব্যক্তিতে রূপ নেয় এবং সবশেষে শব্দ বা কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
সাধারণত এই সব কিছু এত দ্রুত ঘটে যে আমরা পরিস্থিতি নিয়ে ভাবার বা বিচার করার সুযোগ পাই না। এর কারণ হলো ট্রিগার আমাদের মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমকে সক্রিয় করে দেয় যেখানে আবেগ বাস করে; এটি আমাদের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সক্রিয় করে না যেখানে যুক্তিনির্ভর চিন্তা বাস করে। সহজ কথায়, লিম্বিক সিস্টেম হলো একটি বুনো ঘোড়ার মতো, আর প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স হলো তার লাগাম। আমরা হলাম সেই ঘোড়সওয়ার, যার লাগাম ধরার দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাড়ানো সম্ভব।
ট্রিগারের ধরন পরিবর্তন করা
বর্তমান নিউরোসায়েন্স আমাদের জানায় যে, আমরা চাইলে আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক পথগুলোকে পুনরায় সাজাতে পারি। প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স যেকোনো ঘটনায় সুস্থভাবে সাড়া দেওয়ার পথ বের করতে পারে। তখন আমাদের অযৌক্তিক বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার দয়ায় বেঁচে থাকতে হবে না।
তবুও,এই তাড়না সহজে যায় না। এমনকি আধ্যাত্মিক চর্চাও অনেক সময় লিম্বিক সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি থামাতে পারে না। তাই অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেললে নিজের প্রতি কঠোর হবেন না। তার বদলে পর্যবেক্ষণ করুন, শিখুন এবং নিজের প্রতিক্রিয়াগুলোকে পরিমার্জিত করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। Translation from foreign magazines