শীতকালীন রোগ-বালাই ও প্রতিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩:৩৬, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ০৩:৩৮, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫

শীতকালীন রোগ-বালাই ও প্রতিকার

ছবি: সংগৃহীত

১৪৩২ বঙ্গাব্দের পৌষ মাস চলছে। ফলে, বাংলাদেশের সর্বত্রই শীতের প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল অঞ্চলে শীত জেঁকে বসেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে চলেছে শীতকালীন নানা রোগ-বালাই।

শীতে বেশ কিছু বাড়তি রোগ-ব্যাধি দেখা যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই সময়টা বেশ জটিলতা তৈরি করে। ফলে, প্রয়োজন অধিক সতর্কতা ও রোগ-বালাইয়ের প্রতিকার।

আসুন জেনে নিই শীতকালীন নানা রোগ-বালাই এবং তা সামলাতে করণীয়—

শীতে যেসব রোগ সাধারণত হতে পারে :
আমাদের দেশে শীতকালের এই সময়টায় ঠাণ্ডাজনিত সমস্যাগুলোই বেশি দেখা যায়। যেমন: সর্দি-কাশি, অ্যাজমার প্রকোপ বেড়ে যাওয়া, সাময়িক জ্বর, কোল্ড অ্যালার্জি ইত্যাদি। এ সময় বাতাসে ধূলি-বালি বেশি থাকায় অনেকে অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা যায়। শিশু ও বয়স্ক মানুষদের বিশেষ করে কাশি, কোল্ড অ্যালার্জির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। যা সঠিক সময়ে শনাক্ত করা না গেলে সেটা অনেক সময় নিউমোনিয়াতেও রূপ নিতে পারে।  আর ঠাণ্ডার কারণে অনেকের টনসিল বেড়ে গিয়ে ব্যথার সৃষ্টি হতে পারে। 

এ ছাড়া, শীতকালে অনেক স্থানে মশার প্রকোপও বাড়ে। ফলে, মশাবাহিত ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গু রোগসহ নানা ভাইরাস জ্বরের রোগের প্রকোপও দেখা যায়। ডেঙ্গু বর্ষাকালীন রোগ হলেও এখন শীতকালেও এটি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়।

রোগ প্রতিরোধে সতর্কতা ও করণীয় :
(১) ঋতু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শীত এলে অনেকের শরীর চট করে তা খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। তাই অনেকের জ্বর হয়ে থাকে। ফলে, শীতের সময় হালকা কুসুম গরম পানিতে গোছল বা হাতমুখ ধোয়ার অভ্যাস করুন।

(২) এ সময় মশার কামড়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। আর, কাঁপুনি দিয়ে উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর আসা, বার বার জ্বর আসা, গিঁটে ব্যথা ইত্যাদির লক্ষণ দেখা গেলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

(৩) শীতকালে ঠাণ্ডার কারণে শিশুদের এবং অনেক সময় বড়দেরও পাতলা পায়খানা হতে দেখা দেয়। বিশেষ করে যখন বেশি ঠাণ্ডা পড়ে, তখন বয়স্কদেরও পাতলা পায়খানা হয়ে থাকে। এই সমস্যা এড়াতে বাইরের খাবার খাওয়া বাদ দিন এবং খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক হোন। এ ছাড়া, বয়স্ক ও শিশুদের বিশেষ করে গরম কাপড়ের পাশাপাশি সবসময় হাত-মোজা ও পা-মোজা পরে থাকার ব্যবস্থা করুন।

(৪) শীতের সময় বাতাসে ধূলি-বালি বেড়ে যাওয়াতে এ থেকে সুরক্ষা পেতে বাইরে বের হলে মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন।

(৫) এ সময় শুষ্কতার কারণে শরীরের ত্বকও শুষ্ক হয়ে ওঠে। যার ফলে অনেক সময় চুলকানি বা ব্যথা অনুভব হতে পারে। অনেক সময় অ্যালার্জির কারণেও এটি হতে পারে। বিশেষ করে যাদের ধূলি-বালিতে অ্যালার্জি হয়। এটি সামলাতে নিয়মিতভাবেভাবে লোশন বা অলিভ অয়েল বা নারিকেল তেল ব্যবহার করা পারেন।  

(৬) ধূলি-বালিতে যাদের অ্যালার্জি হওয়া বা বৃদ্ধির সমস্যা আছে, তাদের এ রকম চুলকানি হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শুরু থেকেই এ ব্যাপারে সতর্ক হলে চুলকানি বা অ্যালার্জি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকে না।  

(৭) যাদের দীর্ঘমেয়াদি রোগ বা ডায়াবেটিক আছে, শীত তাদের জন্য বিশেষ সমস্যার কারণ হতে পারে। কারণ এই সময়ে তাদের জটিলতা বৃদ্ধি পেতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে অনিদ্রার মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। এ জন্য এই রোগীদের এই সময়ে নিয়মিত চিকিৎসকের পরমর্শে রাখুন । 

(৮) শীতের ঠাণ্ডা একেবারে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। গরম কাপড় পড়তে হবে, কান ও হাত ঠেকে রাখার ব্যবস্থা করুন। গলায় মাফলার ব্যবহার করুন।  

(৯) এ সময় ঠাণ্ডা খাবার, যেমন আইসক্রিম, কোক ইত্যাদি এড়িয়ে চলুন।

(১০) শীতের সময়েও প্রচুর পানি পান করুন। এ ছাড়া ভিটামিন সি রয়েছে এমন খাবার যেমন জলপাই, কমলা, লেবু ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে খেতে পারেন। এগুলো একপ্রকার রোগ প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করে।

(১১) শিশুরা অনেক সময় শরীরে গরম কাপড় রাখে না বা খুলে ফেলে। তাই শীতে তাদের দিকে বিশেষভাবে নজর রাখুন।

(১২) আমাদের পায়ের পাতার রক্তনালীগুলো সাইনাসের সাথে সংযুক্ত। পা ঠাণ্ডা থাকলে সাইনাসের মিউকাস মেমব্রেনে শ্বেত রক্ত ​​কণিকার প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। পা উষ্ণ থাকলে তা রক্তনালীগুলোকে প্রসারিত করে এবং ইমিউন কোষগুলোকে অবাধে চলাচল করতে দেয়। তাই শীতের সময়ে আরামদায়ক মোজা পড়ে থাকুন, তবে ঘুমাবার আগে খুলে ফেলুন।

(১৩) নানাবিধ ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের আমাদের হাতে আনাগোনা লেগেই থাকে। যা হাত থেকে নাক বা মুখে যায়। তখন হাতে লেগে থাকা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে এবং রোগ সংক্রমণ ঘটায়। ফলে, শীতে অবহেলা না করে ভালোভাবে নিয়মিত হাত ধোয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকুন।

(১৪) শীতে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এবং সকালে ঘুম থেকে উঠে সহনীয় গরম পানি দিয়ে কয়েকবার গড়গড়া করুন।

(১৫) শীত এলে কেউ নিয়মিত গোসল করেন গরম পানি দিয়ে। কেউ কেউ গোসল করাই যেন ছেড়ে দেন! অভ্যাস হিসেবে দুটোই অস্বাস্থ্যকর। গরম পানি দিয়ে গোসল করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। আর গোসল না করলে শরীরে ময়লা জমে রোগজীবাণু বাসা বাধে। অবশ্য, পানি বেশি ঠাণ্ডা হলে কিছু গরম পানি মেশাতে পারেন। তবে, খেয়াল রাখুন গোসলের পানির তাপমাত্রা যেন শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে কম হয়।

(১৬) ঠাণ্ডা লাগার প্রবণতা কমাতে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সকালে নাশতার সাথে এক বা দুই কোষ কাঁচা রসুন ও ২৫-৩০ দানা কালোজিরা খেতে পারেন। 

(১৭) যে অঞ্চলে যে মৌসুমে যে ফল জন্মে সেই ফলে থাকে সেই মৌসুমের রোগ প্রতিষেধক ধরা হয়। তাই ডালিম সফেদা, পেঁয়ারা, কমলাসহ শীতকালীন দেশজ ফল এবং গাজর, টমেটো, শিম, ফুলকপি ইত্যাদি সব ধরনের মৌসুমী শাকসব্জি খান। 

(১৮) দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অটুট রাখতে দমচর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দিনে কয়েকবার প্রাণায়াম অনুশীলন যারা করেন তাদের দেহের অক্সিজেন গ্রহণ ক্ষমতা ৩৭% পর্যন্ত বেড়ে যায় বলে বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়। ফলে, বুক ফুলিয়ে দম নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। দিনে কমপক্ষে ছয় দফা দমের চর্চা করুন।

(১৯) শীতে মাংসপেশীগুলো শক্ত হয়ে যায় বলে বাড়ে ব্যথা-বেদনা৷ তাই, দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরে শুয়ে-বসে না থেকে হাঁটা-চলা, শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করুন। বাইরে বের হোন। বুকভরে শ্বাস নিন। গায়ে লাগান মিষ্টি রোদ।

Sara

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন