শেয়ার বিজের প্রতিবেদন নিয়ে রবির আইনি পদক্ষেপ

হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আপিল বিভাগে স্থগিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০০:৩৬, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আপিল বিভাগে স্থগিত

সংগ্রহীত

দৈনিক শেয়ার বিজ কড়চায় মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেডকে নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই ধারাবাহিকতায় শেয়ার বিজকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো, ৪১৪ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবিতে নিম্ন আদালতে মামলা করার আবেদন এবং পরে হাইকোর্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা পরে স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রুল দুই সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্ট বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। পাশাপাশি মামলার বিষয়ে পক্ষগুলোকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, শেয়ার বিজে রবি আজিয়াটাকে নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ আইনি বিরোধের সূত্রপাত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে রবি ও এয়ারটেলের একীভূতকরণের পরও এয়ারটেল ব্র্যান্ড পৃথকভাবে পরিচালিত হওয়া, অবৈধ ভিওআইপিতে রবির সিম ব্যবহারের অভিযোগ, বিটিআরসির জরিমানা, জরিমানার অর্থ পরিশোধ এবং রবি আজিয়াটার আর্থিক ও করপোরেট সুশাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
প্রথম দিকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে রবির বক্তব্যও দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোর বিষয়ে রবির বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হলেও সব ক্ষেত্রে লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
শেয়ার বিজে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে ‘একীভূতকরণের প্রায় এক দশক পরও পৃথক ব্র্যান্ড এয়ারটেল’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন ছিল। রবি আজিয়াটা ও এয়ারটেলের একীভূতকরণের পরও এয়ারটেল ব্র্যান্ড পৃথকভাবে পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি এতে তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশের আগে রবির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং কোম্পানিটির লিখিত বক্তব্য প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয় বলে শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এরপর রবি আজিয়াটার কার্যক্রম নিয়ে আরও কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘অবৈধ ভিওআইপিতে রবির ৫ হাজার ৯৩৫ সিম’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিটিআরসির একটি নোটিশের তথ্য তুলে ধরা হয়।
বিটিআরসির ২১ জুলাইয়ের নোটিশ অনুযায়ী, অবৈধ আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশনে ব্যবহৃত ৮ হাজার ৬৮২টি সিমের মধ্যে রবির ৫ হাজার ৯৩৫টি সিম থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় রবিকে ৫ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার তথ্যও প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়।
শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় রবির বক্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এরপর বিটিআরসির আরোপ করা জরিমানার অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত বিষয় নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করে শেয়ার বিজ।
পরবর্তী সময়ে ‘অর্থ পরিশোধে ‘গ্র্যাচুইটি ফান্ড’ ব্যবহার করে রবি’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ভিআরএস ও সংশ্লিষ্ট অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্র্যাচুইটি ফান্ড ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে অর্থের উৎস এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন তোলা হয়।
শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ প্রতিবেদন প্রকাশের আগেও রবির বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রবি আজিয়াটার আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুসন্ধানসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করে শেয়ার বিজ।
‘ওপেক্স-ক্যাপেক্স থেকে ইডটকো লেনদেন খতিয়ে দেখছে বিএসইসি’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে রবি আজিয়াটার আর্থিক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট লেনদেনের বিভিন্ন বিষয় অনুসন্ধানের আওতায় থাকার কথা তুলে ধরা হয়।
এতে অপারেটিং ব্যয়কে ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার হিসেবে দেখানোর অভিযোগ, ইডটকো গ্রুপের সঙ্গে লেনদেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, করপোরেট সুশাসন এবং তথ্য প্রকাশসংক্রান্ত বিষয় অনুসন্ধানের আওতায় থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
তবে বিএসইসির অনুসন্ধান চলমান থাকলে এসব অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। অনুসন্ধান শেষে কমিশনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই বিষয়গুলোর চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারিত হবে।
প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের পর ৩ আগস্ট ২০২৬ রাতে শেয়ার বিজের কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠায় রবি আজিয়াটা। শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই দিন রাত ১১টা ২১ মিনিটে ই-মেইলের মাধ্যমে নোটিশটি পাঠানো হয়। নোটিশে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো নিয়ে আপত্তি জানানো হয় এবং সংবাদগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য আট ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ৪১৪ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ বা পেনাল্টি দাবি করা হয়। নোটিশ পাওয়ার পর শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে এর জবাব দেওয়া হয়।
শেয়ার বিজের দাবি, লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো নিয়ে রবির পক্ষ থেকে কোনো রিজয়েন্ডার বা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র দেওয়া হয়নি। তবে প্রথম প্রতিবেদনের সময় রবির বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল এবং তা প্রকাশ করা হয়েছিল বলে পত্রিকাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর পরদিন ৪ আগস্ট ২০২৬ রবির পক্ষ থেকে শেয়ার বিজের বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতে মামলা করার আবেদন করা হয়। মামলায় ৪১৪ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ বা মানহানির দাবি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে নিম্ন আদালতে মামলাটি গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই বিষয়টি হাইকোর্টে গড়ায়। রবি আজিয়াটার পক্ষ থেকে হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন আবেদন করা হয়।
রবির আবেদনের পর হাইকোর্ট শেয়ার বিজে রবি-সংক্রান্ত কোনো মিথ্যা, বানোয়াট বা মানহানিকর প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেন।
এর ফলে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ আদালতের উচ্চ পর্যায়ে চলে যায়। তবে হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়।
আপিল বিভাগে শুনানি শেষে হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগকে সংশ্লিষ্ট রুল দুই সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি মামলার বিষয়ে পক্ষগুলোকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা আপিল বিভাগের আদেশের পর কার্যকর থাকেনি। তবে বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পক্ষগুলোকে আদালতের নির্দেশিত স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে।
রবি নিম্ন আদালতে মামলা করার আবেদন করার পর ১৩ আগস্ট সেখানে শুনানির তারিখ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছ থেকে জানা গেছে। শেয়ার বিজের পক্ষের দাবি, ওই পর্যায়ে মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে চূড়ান্ত শুনানি হয়নি।
পরবর্তীতে বিষয়টি আবার আদালতে আসে। এরই মধ্যে আপিল বিভাগ স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়ায় নিম্ন আদালতে মামলার পরবর্তী কার্যক্রমও সংশ্লিষ্ট উচ্চ আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে।
মামলাটি শেষ পর্যন্ত কোন প্রক্রিয়ায় এগোবে, তা সংশ্লিষ্ট আদালতের পরবর্তী আদেশের ওপর নির্ভর করছে।
রবি-শেয়ার বিজের আইনি বিরোধের বিষয়টি পরবর্তী সময়ে অন্যান্য গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা, রবির আইনি পদক্ষেপ এবং আদালতকেন্দ্রিক বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়।
এসব প্রতিবেদনের কিছু বিষয়ে শেয়ার বিজের পক্ষ থেকেও আপত্তি জানানো হয় এবং পরবর্তী সময়ে রিজয়েন্ডার প্রকাশ করা হয়।
তবে অন্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো এই বিরোধের মূল আইনি প্রক্রিয়া থেকে আলাদা একটি পরবর্তী ঘটনা। মূল বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল শেয়ার বিজে প্রকাশিত রবি-সংক্রান্ত সংবাদকে কেন্দ্র করে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে শেয়ার বিজের আইনজীবী ইমরান সিদ্দিক বলেন, “হাইকোর্ট বিভাগ রবি বা এর কর্মীদের সম্পর্কে কোনো মিথ্যা, বানোয়াট বা মানহানিকর বক্তব্য প্রকাশ করা থেকে শেয়ার বিজকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। শেয়ার বিজ ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে। আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ স্থগিত করেন এবং মামলার বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে পক্ষগুলোকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন।
“হাইকোর্ট বিভাগ কোনো পর্যায়েই প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে রবি সম্পর্কে সঠিক তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন প্রকাশে শেয়ার বিজকে নিষেধ করেননি। ফলে রবি সম্পর্কে তথ্যগতভাবে সঠিক এবং যথাযথ প্রমাণসমর্থিত তথ্য প্রকাশে শেয়ার বিজের বিরুদ্ধে কখনো কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না—এখনো নেই।
“তবে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশের কারণে বিচারিক আদালতে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম বর্তমানে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রুল নিষ্পত্তির পরই মামলাটি গ্রহণের বিষয়ে শুনানি হতে পারে।”
রবি আজিয়াটা ও শেয়ার বিজের মধ্যকার বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। একদিকে রবি প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে, অন্যদিকে শেয়ার বিজ প্রকাশিত সংবাদগুলোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা আপিল বিভাগ স্থগিত করেছেন। একই সঙ্গে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট রুল দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পক্ষগুলোকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বলা হয়েছে।
ফলে এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—হাইকোর্টের বিচারাধীন রুলের নিষ্পত্তি এবং এর পর মামলার গ্রহণযোগ্যতা ও মূল অভিযোগের বিষয়ে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত।
সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া রবি ও শেয়ার বিজের এ বিরোধ ইতোমধ্যে লিগ্যাল নোটিশ, ক্ষতিপূরণের দাবি, নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়িয়েছে। ফলে বিষয়টির পরবর্তী আইনি গতিপথ এখন সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশের ওপর নির্ভর করছে।

Sara

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন