চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশ: ০৩:৩৩, ১২ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ০৩:৩৫, ১২ মার্চ ২০২৬
তেনা বা ত্যানা— বাংলা ভাষার এক অদ্ভুত মজার শব্দ। অভিধান বলছে, তেনা বা ত্যানা হলো ছেঁড়া কাপড়ের টুকরা, ন্যাকড়া, মলিন ও ছিন্নবস্ত্রখণ্ড। এক সময় গ্রামবাংলায় কারো হাত-পা ভেঙে গেলে বা কোথাও কেটে গেলে গজ ব্যান্ডেজের অভাবে এই ত্যানা দিয়েই ক্ষতস্থান বেঁধে দেওয়া হতো। সেই ত্যানার প্যাঁচ দিয়ে ক্ষত সামলানোই ছিল তখনকার জরুরি চিকিৎসা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ‘ত্যানা প্যাঁচানো’ শব্দবন্ধটি চিকিৎসার সীমা পেরিয়ে আমাদের সামাজিক জীবনে এক বিশেষ অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছে। এখন ‘ত্যানা প্যাঁচানো’ বলতে বোঝায়— একটি সহজ বিষয়কে এমনভাবে পাকানো, এমনভাবে জটিল করা, যাতে মূল কথাটাই হারিয়ে যায়।
মজার বিষয় হলো, ত্যানা প্যাঁচানোর এই শিল্পে আমরা বাঙালিরা দিন দিন অসাধারণ দক্ষ হয়ে উঠছি। এমনকি বলা যায়, এটি এখন প্রায় আমাদের জাতীয় চরিত্রের অংশ হয়ে গেছে! পৃথিবীর অন্য অনেক জাতি বড় বড় আবিষ্কার করে, নতুন প্রযুক্তি তৈরি করে, মহাকাশে যায়। আর আমরা অনেক সময় ব্যস্ত থাকি— একটা সহজ বিষয়কে কতভাবে জটিল করা যায় সেই সৃজনশীল অনুশীলনে। এই শিল্পের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই, কোনো ডিগ্রি নেই, তবু আশ্চর্যের বিষয়— এতে আমাদের পারদর্শিতা ক্রমশ আন্তর্জাতিক মানের হয়ে উঠছে।
এক সময় এই ত্যানা প্যাঁচানো হতো গ্রামের চায়ের দোকানে। বিকেলের আড্ডায় চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে কেউ একটা কথা বলল, আর সঙ্গে সঙ্গে দশজন সেটাকে এমনভাবে ঘুরিয়ে দিল যে শেষ পর্যন্ত বোঝাই মুশকিল— মূল কথাটা কী ছিল। এখন সেই কাজটি আরও আধুনিক প্রযুক্তির আশীর্বাদে অনেক সহজ হয়ে গেছে। এখন আমাদের হাতে আছে ফেসবুক, ইউটিউব, লাইভ, শর্টস— অসংখ্য প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ ত্যানা প্যাঁচানোর জন্য এখন আর চায়ের দোকানে যেতে হয় না, ঘরে বসেই ‘বিশ্বমানের’ ত্যানা প্যাঁচানো যায়।
ধরুন আপনি খুবই সাধারণ মানুষ। ঈদের ছুটিতে গ্রামে গেছেন। শহরের ধুলোবালি, যানজট, অফিসের ফাইল, বসের ধমক— সবকিছু থেকে কয়েক দিনের মুক্তি পেয়ে মনটা বেশ ফুরফুরে। সকালে উঠেই দেখলেন বাড়ির পাশের পতিত জমিতে একটি গরু দিব্যি শান্তভাবে ঘাস খাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে আপনার মনটা নরম হয়ে গেল। মনে হলো— এই সরল সৌন্দর্যটা ধরে রাখা দরকার। আপনি মোবাইল বের করে গরুটির একটি ছবি তুললেন। তারপর ছবিটি ফেসবুকে দিলেন এবং খুব সরল মনে লিখলেন— ‘বাড়ির আঙিনায় গরু, আয়েস করে ঘাস খাচ্ছে!’
আপনার দায়িত্ব এখানেই শেষ। কিন্তু এখান থেকেই শুরু হবে আপনার বন্ধু ও অনুসারীদের মহান দায়িত্ব— ত্যানা প্যাঁচানো।
প্রথমে কিছু সরল মানুষ আসবে। তারা লিখবে—‘ওয়াও’, ‘সুন্দর’, ‘অসাধারণ’, ‘গ্রামের দৃশ্যটা সত্যিই মন ভালো করে দেয়’। কেউ কেউ একটু আবেগপ্রবণ হয়ে লিখবে— ছোটবেলায় বিকেলে গোধূলীলগ্নে গরু নিয়ে বাড়ি ফেরার দৃশ্য মনে পড়ে গেল। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ শান্ত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। কিন্তু এই শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্তব্যের জগতে প্রবেশ করবেন বানান বিশেষজ্ঞরা। একজন লিখবেন—’গরু নয়, গোরু লিখুন।’ আরেকজন বলবেন—‘বাংলা একাডেমির বানান ভুল, সংস্কৃত ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী শব্দটা অন্যরকম।’ এরপর কেউ এসে ভাষাতত্ত্বের ক্লাস শুরু করবেন।
তারপর আসবেন যুক্তিবাদীরা। তারা বলবেন—বাড়ির আঙিনায় গরু আয়েস করে ঘাস খাবে না তো হুইস্কি খাবে? কেউ আবার গরুর খাদ্যতালিকা নিয়ে এমন বিশদ আলোচনা শুরু করবেন যে দেখে মনে হবে তিনি হয়তো অন্তত দশ বছর গরুর পুষ্টিবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করেছেন।
এরপর হঠাৎ ধর্মীয় ব্যাখ্যা এসে হাজির হবে। কেউ বলবেন— গরু তো গোমাতা। কেউ বলবেন— গরু কোরবানির পশু। কেউ বলবেন— গরু নিয়ে এত আবেগ দেখানো আসলে অন্য সংস্কৃতির প্রভাব। কেউ আবার যুক্তি দেবেন— বাংলার সংস্কৃতি বহুমাত্রিক, এখানে গরুর স্থান বহু পুরোনো।
এই পর্যায়ে রাজনীতি ঢুকে পড়বে। কেউ বলবে— ফ্যাসিবাদের দোসররা এখন গরু নিয়ে মত্ত! কেউ বলবে— এটা কৃষকের অর্থনীতি ধ্বংসের প্রতীক। কেউ বলবে— সব কর্পোরেট কোম্পানি গরুর ব্যবসা দখল করে নিচ্ছে। কেউ আবার লিখবে— দেশে সব দলের রাজনীতি করার সুযোগ নেই, তেল-গ্যাস সংকট, দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব— এত সমস্যা থাকতে গরুর ছবি পোস্ট করা আপনার কাছে আশা করা যায় না!
এরপর আলোচনায় ঢুকে পড়বে ক্রিকেট। একজন মন্তব্য করবে— ‘কয়েকটি ব্যক্তির কারণে বাংলাদেশ ক্রিকেটও এখন গরুর মতোই ঘাস খাচ্ছে।’ আরেকজন বলবে— ‘পাকিস্তানের সঙ্গে সিরিজ জিতলে তখন বুঝবেন গরু কী।’ তৃতীয়জন বলবে—’ক্রিকেট বোর্ডটাই আসলে গরুর খামার।’
এর মধ্যে ঈদের চাঁদ উঠলে নতুন বিতর্ক শুরু হবে। কেউ বলবে— চাঁদ দেখা কমিটি ভুল করেছে। কেউ বলবে— সৌদি আরবের সঙ্গে মিলিয়ে ঈদ করা উচিত। কেউ বলবে— এটা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয়। কেউ বলবে— এটা রাজনীতির বিষয়। আর কেউ হয়তো ঘোষণা করবে— চাঁদ দেখা নিয়েও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে।
রমজানের ঈদের পর কোরবানির ঈদ এলে কোরবানির গরু নিয়েও নতুন ত্যানা প্যাঁচানো শুরু হবে। কেউ বলবে— গরুর দাম বেশি। কেউ বলবে— দালালদের সিন্ডিকেট। কেউ বলবে— কোরবানি করা উচিত কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। কেউ আবার বলবে— কোরবানি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আরেকজন বলবে— না, কোরবানি সামাজিক সাম্যের প্রতীক।
এভাবে একটি নিরীহ গরুর ছবি থেকে শুরু হয়ে আলোচনা পৌঁছে যায় ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, ক্রিকেট, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জলবায়ু পরিবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত।
এই ত্যানা প্যাঁচানো প্রজন্মের আরেকটি বিশেষত্ব হলো— তারা কোনো বিষয়কে সোজাসুজি গ্রহণ করতে শেখেনি। আপনি যদি ভোরে উঠে ফেসবুকে লেখেন, ‘আজ আকাশটা খুব নীল’, সঙ্গে সঙ্গে ত্যানা বিশেষজ্ঞরা হাজির হবে। কেউ বলবে— নীল মানেই বিষাদ, আপনি কেন বিষাদ ছড়াচ্ছেন? কেউ বলবে— নীল তো অমুক দলের রং, আপনি কি তাদের প্রচারণা চালাচ্ছেন? আবার কেউ হয়তো আবহাওয়ার রিপোর্ট টেনে এনে প্রমাণ করে দেবে যে আপনার চোখেই সমস্যা হয়েছে।
ঈদের বাজারে গিয়ে আপনি যদি নতুন পাঞ্জাবি কিনে ছবি দেন, তাতেও শান্তি নেই। কেউ কাপড়ের মান নিয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার সেজে বিশ্লেষণ করবে। কেউ বলবে— দেশে যখন চালের দাম বাড়ছে, তখন আপনি নতুন পাঞ্জাবি পরে ছবি দিচ্ছেন কেন? আপনার কি দেশপ্রেম নেই? কেউ আবার পাঞ্জাবির হাতা ছোট না বড়— এই নিয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনার বসিয়ে দেবে।
ক্রিকেটে বাংলাদেশ জিতলেও ত্যানা আছে, হারলেও ত্যানা আছে। জিতলে বলা হবে—প্রতিপক্ষ দুর্বল ছিল। হারলে বলা হবে— টস, পিচ, আবহাওয়া, বোর্ড রাজনীতি— সব মিলিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র। এমনকি আপনি যদি শুধু ‘ঈদ মোবারক’ লিখে শুভেচ্ছা জানান, তাতেও কেউ বলবে— মোবারক না মুবারাক? কেন আরবি বানান ব্যবহার করলেন না?
এই ত্যানা প্যাঁচানো প্রজন্মের অনেকেরই হয়তো গভীর অন্তর্দৃষ্টি নেই, জীবনবোধ নেই, দার্শনিক চর্চা নেই। কিন্তু একটি বিষয়ে তারা বিস্ময়কর দক্ষ— সহজ জিনিসকে জটিল করা। সরল কথাকে বিতর্কে পরিণত করা। একটি গরুকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইস্যু বানানো।
প্রশ্ন হলো, এই ত্যানা প্যাঁচানো প্রজন্মকে নিয়ে আমরা কোথায় যাব? ঈদের চাঁদ উঠলেও তারা ত্যানা প্যাঁচাবে, ক্রিকেট ম্যাচ হলেও প্যাঁচাবে, নির্বাচন হলেও প্যাঁচাবে, যুদ্ধ হলেও প্যাঁচাবে। পৃথিবী যদি কোনোদিন মঙ্গল গ্রহে উপনিবেশ স্থাপন করে, তখনও হয়তো কেউ লিখবে—‘মঙ্গলে মানুষ গেল কেন? আগে পৃথিবীর সমস্যা সমাধান করুন।’
শেষ পর্যন্ত মনে হয়, আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে ত্যানা প্যাঁচানোই যেন সবচেয়ে বড় সামাজিক দক্ষতা। একদিন হয়তো ইতিহাস লিখবে— মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল আগুন, চাকা আর ইন্টারনেট। আর আমাদের এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার— ত্যানা প্যাঁচানো।
এটা আমাদের একান্তই নিজস্ব। অন্তত এই একটি বিষয়ে আমরা বুক চিতিয়ে বলতে পারি—এই গুণে গুণান্বিত হতে বাঙালি জাতি কারও ওপর নির্ভর করে নাই। বহু কাজই আমরা ভালোভাবে করেছি, কিন্তু সত্যি বলতে কী— ত্যানা প্যাঁচানোর মতো নিখুঁত দক্ষতা হয়তো আর কোনো কাজে দেখাতে পারিনি।
হয়তো ভবিষ্যতের কোনো ইতিহাসবিদ একদিন লিখবেন— বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের অদ্ভুত ক্ষমতা; তারা তিলকে তাল করতে পারত, আর সেই তালকে আবার পাকিয়ে ত্যানা বানাতে পারত। আর সেই ত্যানার ভেতরেই তারা দিব্যি বসে বসে তর্ক করত— জীবন আসলে কোথায় হারিয়ে গেল!