চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশ: ২০:০৭, ৪ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৪৭, ১১ এপ্রিল ২০২৬
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন ভয়াবহ দুর্যোগকবলিত হয়ে পড়েছে। একের পর এক সংকট গ্রাস করছে শিক্ষাকে। এর ফলে শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ, পড়াশোনার ধারাবাহিকতা, শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ— সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০২০ সালে করোনা মহামারী দিয়ে শিক্ষার দুর্যোগ শুরু হয়। করোনাভাইরাসের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারী নীতি এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রভাব মিলিয়ে শিক্ষা খাত এখন নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে।
গত কয়েক বছরের শিক্ষাঙ্গনের এক একটা করে অধ্যায় যেন শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আলাদা আঘাত। করোনা মহামারী তো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রায় মৃত্যুশয্যায় ফেলে দিয়েছিল। প্রায় দুই বছর স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শেখার অভ্যাস হারিয়ে ফেলে। অনলাইন ক্লাসের নামে শহরের বাচ্চারা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর সুযোগ পেলেও গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরা সেই সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। গ্রামের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকত শুধু।
অনলাইন শিক্ষার সীমাবদ্ধতা— বিশেষত গ্রামীণ ও নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে— একটি বড় বৈষম্য তৈরি করে। এই সময়ের শেখার ঘাটতি পূরণের জন্য যে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল, তা বাস্তবে দেখা যায়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বুনিয়াদি দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ে, যা পরবর্তীকালে তাদের সামগ্রিক শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রায় দুই বছরের এই দুঃস্বপ্নের যাত্রা শেষে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো একটা কিছু হতে না হতেই এল ২০২৪-এর আন্দোলন। আন্দোলন মানে শুধু স্লোগান নয়, আন্দোলন মানে গুলি, মানে রক্ত, মানে লাশ, কারফিউ আরও ভয়াল সব ঘটনা। শিক্ষার্থীরা কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়েছিল বই পড়তে, অথচ ফিরেছে ট্রমা নিয়ে। অনেকের চোখে এখনও ভেসে ওঠে সেই কান্না, সেই চিৎকার, সেই দৌড়—যেখানে বাঁচাটাই যেন বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছিল। আন্দোলন, সহিংসতা, গুলিবর্ষণ, কারফিউ— এসব শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখেনি, বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক জগতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। ট্রমা, ভয় এবং অনিশ্চয়তা অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষা শুধু বইপড়া নয়; এটি একটি মানসিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়াটি যখন বার বার বিঘ্নিত হয়, তখন শিক্ষার্থীরা মনোযোগ হারায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহই হারিয়ে ফেলে।
অন্তর্বর্তী সরকার এল। অনেকের আশা ছিল, এখন শিক্ষাঙ্গন আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে। কিন্তু উল্টো শুরু হলো আরেক নৈরাজ্য। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ পড়াশোনার চেয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বা তথাকথিত সামাজিক কার্যক্রমে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে। যদিও নাগরিক দায়িত্ববোধ একটি ইতিবাচক বিষয়, কিন্তু তা যখন শিক্ষার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমস্যা তৈরি হয়। একইসঙ্গে শিক্ষকদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে হেনস্তা, জোরপূর্বক পদত্যাগ এবং অপমানজনক আচরণ শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিক্ষাঙ্গন তখন আর বিদ্যাপীঠ ছিল না, বরং ক্ষমতার এক অদ্ভুত খেলার মাঠে পরিণত হয়।
এ সময় আরেকটি গুরুতর সমস্যা ছিল ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ে কিছু ব্যক্তির অপব্যবহার। এই ধরনের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার চর্চা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি অরাজক ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলে, যেখানে জবাবদিহির অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে প্রকৃত নেতৃত্ব ও ইতিবাচক উদ্যোগগুলো আড়ালে পড়ে যায়, আর নেতিবাচক কর্মকাণ্ড সামনে চলে আসে।
নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও দেখা যায় চরম অস্থিরতা। পাঠ্যসূচি পরিবর্তনের নামে তাড়াহুড়া করে এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি কার্যকর কারিকুলাম তৈরির জন্য প্রয়োজন গবেষণা, পাইলটিং এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি; কিন্তু এখানে তা অনুপস্থিত ছিল। ফলস্বরূপ, ভুল ও অসংগত বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বই মুদ্রণের বিশৃঙ্খলা—যা বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার দীর্ঘদিনের ইতিবাচক ঐতিহ্যকে ব্যাহত করে। এই ব্যর্থতা শুধু প্রশাসনিক নয়, এটি শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতার ওপর সরাসরি আঘাত। ১৮ মাসের সেই অন্তর্বর্তী শাসন শেষে শিক্ষার চেহারাটা যেন আরও বিকৃত হয়ে গেল।
এরপর নির্বাচনকালীন অস্থিরতা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও একধাপ পিছিয়ে দেয়। নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনিক মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায়, যার ফলে শিক্ষা খাত আবারও উপেক্ষিত থাকে। নির্বাচন শেষে নতুন সরকার এল, কিন্তু তখন শুরু রমজান। তারপর ঈদ। প্রায় মাসাধিক কাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ছুটি ফুরোলেও মন ফেরে না। ক্লাসে বসে শিক্ষার্থীদের চোখে এক অদ্ভুত উদাসীনতা, যেন তারা ভুলেই গেছে কীভাবে পড়ার টেবিলে মন বসাতে হয়।
এমন সময় এল আবার আন্তর্জাতিক সংকট। ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গায়ে পড়ে যুদ্ধে জড়াল। দূরের যুদ্ধ, কিন্তু তার প্রভাব এল আমাদের দোরগোড়ায়— জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিল। সংকট দেখা দিল গ্যাস ও বিদ্যুতে। এই সংকটের মুখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে বন্ধ রাখা বা অনলাইন ক্লাসে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব উঠে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের সব শিক্ষার্থী সমানভাবে অনলাইন শিক্ষার সুবিধা পায় না। ফলে আবারও বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এই বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে প্রযুক্তির প্রভাব একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একদিকে যেমন তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করেছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোবাইল-ইন্টারনেট-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন শিক্ষার্থীদের শিরায় শিরায় বিষ ঢেলে দিচ্ছে। তারা পড়ার টেবিলে বসে না, বরং ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করে, ভিডিও দেখে, গেম খেলে। যেসব অভিভাবক সন্তানকে নিজের চোখে দেখে রাখতে পারেন, যাদের সময় আছে, ধৈর্য আছে, তাদের সন্তানরা একটু ভালো করছে। কিন্তু যেখানে বাবা–মা দুজনই চাকরি করতে ব্যস্ত, অথবা নিরক্ষর, অসেচেতন, তাদের সন্তানরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে।
এর ওপরে আছে শিক্ষা নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারা। সরকার বদলালেই যেন নতুন করে শিক্ষাব্যবস্থা সাজানোর হিড়িক পড়ে। নতুন কারিকুলাম আসে, নতুন পরীক্ষাপদ্ধতি আসে। শিক্ষকরা বুঝতে না বুঝতেই আবার নতুন নিয়ম চলে আসে।
অভিভাবকেরা বিভ্রান্ত— ‘এখন তো আমি বুঝি না বাচ্চাকে কী পড়াব?’ শিক্ষকেরাও অসহায়। তাদের অনেককে একদিনের ট্রেনিং দিয়ে ক্লাসে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিভ্রান্ত শিক্ষক বিভ্রান্ত শিক্ষার্থী তৈরি করেন। পড়ালেখা তখন শুধু একটা নামমাত্র ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, আনন্দ নেই, জ্ঞানপিপাসা নেই, আছে শুধু পরীক্ষায় পাস করার একটা কৃত্রিম চাপ।
এই সামগ্রিক চিত্র থেকে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে একটি গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার সমাধান তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপে সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত এবং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে যতটা সম্ভব মুক্ত রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ ও নিরপেক্ষ স্থান হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। দ্বিতীয়ত, কারিকুলাম প্রণয়নে ধারাবাহিকতা ও গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, বিশেষ করে যারা ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল ডিভাইসকে শত্রু নয়, বরং সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করার কৌশল শেখাতে হবে। অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, অনলাইন ও অফলাইন শিক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী পিছিয়ে না পড়ে।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষাকে একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে—শুধু নীতিগতভাবে নয়, বাস্তব প্রয়োগেও। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। বর্তমান সংকট যদি সঠিকভাবে মোকাবিলা করা না যায়, তবে এর প্রভাব শুধু একটি প্রজন্মেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা দীর্ঘমেয়াদে জাতির সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। মনে রাখা দরকার যে, শিক্ষা মানে আগামীর ভিত। যে দেশের শিক্ষা পঙ্গু, সেই দেশের স্বপ্নও পঙ্গু। শিক্ষা বাঁচলে বাঁচে দেশ, শিক্ষা বাঁচলে বাঁচে মানুষ।