মোঃ কামরুল ইসলাম
প্রকাশ: ২০:০৮, ৪ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১২:০৭, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি সঙ্কটমুখী ঘূর্ণিতে দাঁড়িয়ে আছে— রফতানি স্থবির, রেমিট্যান্স চাপে, বৈদেশিক মুদ্রা টানাপোড়েন এবং জ্বালানি ব্যয়– সবই অর্থনীতিকে ক্লান্ত করেছে। এই অবস্থায় নতুন আয়ের উৎস জরুরি।
একটি দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে নানাবিধ অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে ব্যবহার করে ধীরলয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথগুলো খুঁজে বের করে। বিশ্ব অর্থনৈতিক কাঠামোতে বিমানবন্দর শুধুমাত্র যাত্রী পারাপারের জন্য ব্যবহৃত হয় না। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলছে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক অঞ্চল— এয়ারপোর্ট ইকোনমি বা এরো-সিটি। যেখানে রানওয়ের চারপাশে জন্ম নেয় শিল্প, বাণিজ্য, লজিস্টিকস, পর্যটন, হোটেল, কার্গো হাব, প্রযুক্তি পার্ক এবং উচ্চমূল্যের পরিষেবা খাত। অর্থনীতির ভাষায় এটি এখন ‘এরোট্রপলিস ইকোনমি’, অর্থাৎ এক নতুন নগর-অর্থনীতি যা বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত হয়।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (তৃতীয় টার্মিনালসহ) দ্রুত উন্নয়ন, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণ, পাশাপাশি কক্সবাজার ও সৈয়দপুরের আঞ্চলিক হাব তৈরির পরিকল্পনা— সব মিলিয়ে এই দেশের জন্য বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতি আর স্বপ্ন নয়, বরং বাস্তব সম্ভাবনার দরজায় কড়া নাড়ছে। যা একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সহায়তা করবে।
বিমানবন্দর অর্থনীতির মূল শক্তি— গতি, সংযোগ ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মুভমেন্ট। আধুনিক অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর— দ্রুততম সময়, দ্রুত সংযোগ ও উচ্চমূল্যের বাণিজ্যের গতিশীলতা।
বিমানবন্দর এই তিনটিকেই একই সঙ্গে সরবরাহ করে। অথচ বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে স্থলপথে পরিবহন ধীর, ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে নষ্টযোগ্য পণ্য বা পচনশীল দ্রব্য, উচ্চমূল্যের সামগ্রী এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিমানবন্দর ব্যবহার অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বিমানবন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতি দেশকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দেয়। সেই সক্ষমতা অর্জনে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গুলো এখন পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি।
উন্নত দেশগুলোতে বিমানবন্দরই হয়ে উঠছে নতুন ব্যবসার কেন্দ্র— যেমন সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি, দুবাইয়ের আল-মাকতুম, দোহা হামাদ, ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বা সিউলের ইনচন। এই বিমানবন্দরগুলো বছরে বিলিয়ন ডলার আয় করে শুধু যাত্রী পরিবহন থেকে নয়, বরং বিমানবন্দর-ঘেঁষা অর্থনৈতিক অঞ্চল, রিয়েল এস্টেট, হোটেল, এমিউজমেন্ট পার্ক, কার্গো ভিলেজ, চিকিৎসা, শিক্ষা, টেকনোলজি-ভিত্তিক পার্ক ও সুপার শপ কিংবা আধুনিক মার্কেট থেকে।
বাংলাদেশ এই মডেল গ্রহণ করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে বিপ্লব আনা সম্ভব। যে দেশ বিমানবন্দরকে সঠিকভাবে কাজে লাগায়, সেখানেই ভবিষ্যতের অর্থনীতি গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের সামনে সেই সুযোগ এখনো খোলা।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের সম্ভাবনা: এরো-সিটির জন্য আদর্শ তিনটি পয়েন্ট
• তৃতীয় টার্মিনাল কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক লজিস্টিক হাব— ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ভবিষ্যতে বছরে ২৪ মিলিয়ন যাত্রী ধারণ করার সুযোগ আছে। যদি এর সঙ্গে বিশ্বমানের কার্গো ভিলেজ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সুবিধা, স্বতন্ত্র কাস্টমস জোন ও ডেডিকেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যোগ করা যায়, তবে রফতানির গতি বাড়বে, নষ্টযোগ্য পণ্য (ফল, সবজি, ফুল, মাছ) দ্রুত পৌঁছাবে, ই-কমার্স ও কুরিয়ার বাজারও বহুগুণ বাড়বে। ফলে, বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা হবে আগ্রহী। আজকের বিশ্বে দ্রুত পরিবহনের ওপর নির্ভর করে একটি দেশের বাণিজ্য প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশ এই দিক থেকে পিছিয়ে আছে— কিন্তু দ্রুততম সময়ে এ সমস্যা সমাধানের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
• কক্সবাজার— নতুন আঞ্চলিক বিমান হাব ও ট্যুরিজম ইকোনমি। কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ ট্যুরিজম-ভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে— রিসোর্ট শহর, আন্তর্জাতিক হোটেল চেইন, মেডিকেল পর্যটন, কনভেনশন সেন্টার, ক্রীড়া পর্যটন (মেরিন স্পোর্টস)। সবকিছু উন্নত করা সম্ভব। শ্রীলংকা, মালদ্বীপ বা থাইল্যান্ডের মতো পর্যটন-নির্ভর অর্থনীতি তৈরি করতে কক্সবাজার একটি উন্নত প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।
• চট্টগ্রাম— কার্গো, শিপিং এবং এয়ার-সী কম্বাইন্ড লজিস্টিকস। চট্টগ্রাম বন্দরের পাশে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উন্নয়ন করলে সমুদ্র-আকাশপথ ভিত্তিক সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা বিশ্বের দ্রুততম ও লাভজনক পরিবহন ব্যবস্থার একটি। এই মডেলে— সমুদ্রপথে সস্তায় কাঁচামাল পরিবহন করা হয়, বিমানপথে দ্রুত পরিবহন করা যায় ফাইনাল প্রোডাক্ট যেমন গার্মেন্টস পণ্য। বাংলাদেশের গার্মেন্টস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং হাইটেক ডিভাইস এই মডেলে বিশাল লাভবান হতে পারে।
এ ছাড়া, ভবিষ্যতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ন্যায় সিলেট ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে নিয়েও এ্যারো-সিটির মডেল নিয়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতির খাতভিত্তিক সম্ভাবনা
• এভিয়েশন ও যাত্রী সেবা— নতুন বিমান, নতুন রুট, ট্রানজিট যাত্রী আকর্ষণ এবং বাজেট এয়ারলাইন্সের সম্প্রসারণ দেশের বিমান খাতকে নতুন রূপ দিতে পারে। বাংলাদেশ এখনো ট্রানজিট ব্যবসায় একেবারেই পিছিয়ে। অথচ ঢাকা-চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-পূর্ব এশিয়া রুটের জন্য অন্যতম কেন্দ্র হতে পারে।
• আন্তর্জাতিক কার্গো ও কুরিয়ার— বিশ্বে কার্গো বাজার যাত্রী পরিবহনের চেয়েও দ্রুত বাড়ছে। বিমানবন্দরভিত্তিক কার্গো জোন তৈরি হলে ডিএইচএল, ফেডএক্স, ইউপিএস এর মতো কোম্পানিগুলো লোকাল হাব খুলতে পারে যার দ্বারা ২৪ ঘণ্টা অপারেশন সম্ভব ও দেশীয় উদ্যোক্তারা এক্সপ্রেস লজিস্টিক শিল্পে প্রবেশ করতে পারবে।
• হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও কনভেনশন ইন্ডাস্ট্রি— প্রতিটি বড় বিমানবন্দরের পাশে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল গড়ে ওঠে। ফলে, চাকরির বাজার সৃষ্টি হয়, বিদেশি যাত্রীদের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন, রিয়েল এস্টেটের বিকাশ, তৃতীয় টার্মিনালের পাশে পরিকল্পিত বিমানবন্দর সংলগ্ন হসপিটালিটি জোন বাস্তবায়ন হলে দেশের পর্যটন আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
* হাইটেক পার্ক ও ইনোভেশন সিটি— আন্তর্জাতিক মানের আইটি হাব বিমানবন্দরের কাছে হলে বিদেশি আইটি ফার্ম বিনিয়োগে আগ্রহী হয়, দক্ষ জনবল সহজে যাতায়াত করতে পারে, প্রযুক্তিপণ্য দ্রুত আমদানি-রফতানি হয়, বিশ্বের অনেক দেশে এখন এয়ারপোর্ট-লিঙ্কড টেক সিটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
* কর্মসংস্থানের বিশাল বিস্তার— বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতি হাজার হাজার নয়, লক্ষাধিক কর্মসংস্থান তৈরি করে। যেমন— এভিয়েশন ও গ্রাউন্ড সার্ভিস, লজিস্টিক্স ও কার্গো, হোটেল, খাদ্য ও খুচরা বাণিজ্য, রিয়েল এস্টেট, সিকিউরিটি ও টেকনিক্যাল সেবা। বাংলাদেশে যুবসমাজের জন্য এটি হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্তিশালী চাকরির ক্ষেত্র।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ছবি : সংগৃহীত
বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতি অনেক চ্যালেঞ্জিং— যা এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই
১. প্রশাসনিক জটিলতা ও কাস্টমস দেরি— বিমানবন্দর অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাধা, ঝামেলাপূর্ণ কাস্টমস প্রক্রিয়া। দ্রুত, স্বচ্ছ, ডিজিটাল সিস্টেম ছাড়া বিনিয়োগকারীরা সন্তুষ্ট হবে না।
২. অবকাঠামো দুর্বলতা— বিমানবন্দর থেকে শহরে পৌঁছাতে দেড়–দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় হয় যার কারণে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিমানবন্দরের সাথে এলিভেটেড এক্সপ্রেস, মেট্রোরেল লিঙ্ক এবং ২৪/৭ অপারেশন খুবই জরুরি।
৩. দক্ষ জনবলের অভাব— পাইলট, এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার, কার্গো বিশেষজ্ঞ, এয়ার ট্রাফিক কনট্রলার, যা বাংলাদেশে সংকট রয়েছে। বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন।
৪. বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা— সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে নীতিরও পরিবর্তন হয়। দ্রুতগতিতে নীতি পাল্টে যায়। যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে উঠে না। দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে স্থায়িত্ব এবং বিশ্বাস স্থাপন সবচেয়ে বড় বিষয়।
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। প্রায় ৫৪টি দেশের সাথে এয়ার সার্ভিস এগ্রিমেন্ট থাকার পরও শুধু মাত্র সক্ষমতা ও সুষ্ঠ পরিকল্পনার অভাবের কারণে বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার উপযোগী করতে পারছে না। বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আরও বেশী সময়োপযোগী করতে পারলে দেশের সার্বিক অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটানো সহজতর হবে।
লেখক : মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স