বয়স বাড়লেও সুস্থ থাকার ৮টি উপায়

ভেরোনিক গ্রীনউড

প্রকাশ: ০৩:৩০, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১২:০৫, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বয়স বাড়লেও সুস্থ থাকার ৮টি উপায়

ছবি: সংগৃহীত

'ফ্রামিংহাম হার্ট স্টাডি' নামটির সাথে অধিকাংশ মানুষ পরিচিত না-ও হতে পারেন। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের ওপর পরিচালিত এই বিশাল গবেষণাটি বর্তমানে ৭৭তম বছরে পদার্পণ করেছে। ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর নিবিড় বিশ্লেষণ চালিয়ে এই গবেষণাটি আমাদের সুস্বাস্থ্যময় বার্ধক্য সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। হৃদরোগের ঝুঁকি পরিমাপের প্রথম 'চেকলিস্ট' এই গবেষণার মাধ্যমেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

অবশ্য, শুরুতে এটি কেবল হৃদরোগের ওপর গুরুত্ব দিলেও, বর্তমানে এটি মস্তিষ্ক, যকৃত এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বার্ধক্য নিয়েও তথ্য প্রদান করছে।

‘ফ্রামিংহাম হার্ট স্টাডি’ হচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম সময় ধরে চলা একটি কমিউনিটিভিত্তিক গবেষণা। ১৯৪৮ সালে ম্যাসাচুসেটসের ফ্রামিংহাম শহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে নিয়ে এটি শুরু হয়েছিল। মূল লক্ষ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হৃদরোগের যে মহামারী দেখা দিয়েছিল, তার মূল কারণগুলো খুঁজে বের করা।

তৎকালীন গবেষকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে হৃদরোগের পেছনে বংশগত বা পারিবারিক প্রভাবও থাকতে পারে। তখনো ডিএনএ আবিষ্কৃত হয়নি। গবেষকরা প্রতি দুই বছর অন্তর অংশগ্রহণকারীদের শারীরিক পরীক্ষা করতেন, রক্ত সংগ্রহ করতেন এবং তাদের জীবনযাত্রার অভ্যাসগুলো পর্যবেক্ষণ করতেন। ১৯৬০ সালের দিকে তারা নিশ্চিত হন যে রক্তে কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ এবং ধূমপানের সাথে হৃদরোগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পরবর্তীকালে স্থূলতা ও কায়িক পরিশ্রমহীন জীবনযাত্রার প্রভাবও সামনে আসে হৃদরোগের কারণ হিসেবে।

পরবর্তীকালে মূল অংশগ্রহণকারীদের সন্তান ও তাদের জীবনসঙ্গীদেরও এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে করে বংশগত ও পরিবেশগত বিষয়গুলো বোঝা সহজ হয়। ২০০০ সালের পর তৃতীয় প্রজন্মকেও যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে এই গবেষণায় ছয়টি আলাদা গ্রুপকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া, আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আমরা ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এবং এপজেনেটিক্সের মাধ্যমে কোষের পরিবর্তনগুলোও বুঝতে পারছি।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন এই গবেষণার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে 'লাইফস এসেনশিয়াল এইট'  বা ‘জীবনযাপনের আটটি অপরিহার্য’ বিষয়ের একটি তালিকা তৈরি করেছে। এগুলো মেনে চললে কেবল হৃদরোগ নয়, বরং আলঝেইমার্স, ক্যান্সার এবং আর্থ্রাইটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদী রোগের ঝুঁকিও কমে যায়।

এই ৮টি উপাদান হলো : 
১. স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকা : পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণ। 
২. শারীরিক পরিশ্রম : নিয়মিত ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম করা। 
৩. নিকোটিন বর্জন : সিগারেট বা যেকোনো ধরনের তামাকজাত দ্রব্য এড়িয়ে চলা। 
৪. পর্যাপ্ত ঘুম : নিয়মিত এবং মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা। 
৫. সঠিক ওজন : শরীরের উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। 
৬. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ : উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। 
৭. রক্তে শর্করার মাত্রা : ডায়াবেটিস বা সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা। 
৮. রক্তের লিপিড বা কোলেস্টেরল : কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা।

এগুলোর প্রতিফল হলো আপনার 'হেলথস্প্যান' বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ আপনি কেবল দীর্ঘকাল বাঁচবেনই না, বরং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকবেন।
 
এগুলো মেনে না-চলার বিষয়ে ডক্টর লয়েড জোনস আক্ষেপ করে বলেন, আমরা ৬০ বছর ধরে এগুলো জানলেও জনস্বাস্থ্য নীতি বা ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে এগুলো পুরোপুরি প্রয়োগ করতে পারছি না। আমরা আমাদের সমাজ, পরিবেশ বা খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করিনি যা এই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলোকে সহজ করে দেয়।

তবে, পরিবর্তন সম্ভব। সত্তরের দশকে ফিনল্যান্ডে হৃদরোগে মৃত্যুর হার ছিল বিশ্বে সর্বোচ্চ। তারা ফ্রামিংহাম গবেষণার তথ্য ব্যবহার করে জনস্বাস্থ্য নীতিতে পরিবর্তন আনে। তারা ধূমপানের নীতি কঠোর করে, মাংসে ভর্তুকি কমিয়ে ফল ও সবজিতে ভর্তুকি দেওয়া শুরু করে। ত্রিশ বছর পর দেখা গেল, সেখানে হৃদরোগে মৃত্যুর হার ৮৪% কমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও ১৯৬৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে মৃত্যুর হার ৭০% কমেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ২০১১ সালের পর থেকে স্থূলতার মহামারীর কারণে এই অগ্রযাত্রা থমকে গেছে। অতিরিক্ত ওজনের ফলে রক্তচাপ ও শর্করার মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি ফের বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অবশ্য, আশাপ্রদ তথ্য হলো— গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ জিন রয়েছে তারাও যদি ভালো জীবনযাত্রা উপরের আটটি পয়েন্ট মেনে চলেন, তবে তারা গড়ে ১২ বছর বেশি বাঁচতে পারেন তাদের তুলনায় যাদের জিন ভালো কিন্তু জীবনযাত্রা খারাপ। আরও বড় কথা, তারা হৃদরোগ ছাড়া গড়ে ১৯ বছর বেশি সুস্থ জীবন কাটাতেও পারেন।

আসলে, জিন আমাদের নিয়তি নয়। আমরা আমাদের জীবনযাত্রার মাধ্যমে বার্ধক্যকেও আনন্দময় করতে পারি। তবে এর জন্য আমাদের একার চেষ্টাই যথেষ্ট নয়; সরকারি নীতি, নিরাপদ রাস্তা, বিষমুক্ত বাতাস এবং সস্তায় পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তাও প্রয়োজন। সূত্র : টাইম

Sara

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন