আহমাদ ফেরদৌস
প্রকাশ: ০৩:৪২, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১২:০৬, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শীতের সকালে গাছিরা খেজুরগাছ থেকে রস পেড়ে নিয়ে যাচ্ছেন
ষড়ঋতুর এই দেশে হেমন্তের বিদায়ঘণ্টা বাজতেই উত্তরের হিমেল হাওয়া যখন হানা দেয় তখন বৃহত্তর যশোরাঞ্চলসহ সমগ্র বাংলাদেশে প্রকৃতির রূপ বদলাতে শুরু করে এক যাদুকরী আবেশে। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই ঐতিহাসিক জনপদ যশোরে শীত কেবলমাত্র একটি ঋতু নয়, এটি এক অভূতপূর্ব উৎসবের নাম। কুয়াশার মৃদু চাদরমুড়ি দিয়ে যখন ভোরের সূর্য ওঠে, তখন যশোরের মেঠোপথ আর খেজুর গাছের সারীর শোভা যেন এক অপরূপ সৌন্দর্যের গল্প বলে।
শীতের প্রকৃতি কেবল রূপের খেলা নয়; জীবনের শেকড়মুখী টান। যেখানে মাটির সোঁদা গন্ধে ঘেরা, সবুজে-শ্যামলে ভরা প্রকৃতি তথা ঐতিহ্যবাহী গ্রামবাংলার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ। শীতকাল মানে কেবল ঠাণ্ডা নয়, এটি একটি আবেগের জোয়ার, যেখানে খেজুরের রসের আকর্ষণ, পিঠার স্নিগ্ধতা আর লোকগানের সুরে মন ভরে যায় এক অনন্য মায়ায়।
সবুজের চাদরে শোভিত মাঠ !
কৃষকের সোনালী স্বপ্নের শীতকালীন সকালে যশোরাঞ্চলের মাঠগুলো হয়ে ওঠে এক স্বপ্নের রঙিন কারুকাজে শোভিত। কৃষকের ক্ষেত যেন পরম যত্নে সবুজের গালিচা বিছিয়ে দেওয়া মাঠ। আর দিগন্তজোড়া বিস্তৃত ওই ফসলের মাঠে প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠে কৃষকের ফসলপ্রাপ্তির হাসিতে। সূর্যের প্রথম আভায় ভরা মাঠে শোভা পায় শিম, গাজর, শাকসব্জী, ফুলকপি, পাতাকপি, বেগুন, পটল, আলু আর লাল টকটকে টমেটোর ক্ষেতগুলো। লাউ ও বরবটির মাচায় সুবিন্যস্ত মাঠ ও বাড়ীর আঙিনা এবং পুঁইশাক, লালশাক, পালংশাক, ডাটাশাক, ভাতীশাকের কচি ডগাগুলো শীতের সকালে সূর্যের সোনালী আলোয় চিকচিক করে। কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনীর এই ফসল শুধু ওই অঞ্চলে নয়, বরং সারা দেশের চাহিদা জোগাতে একটা বড় ভূমিকা পালন করে।
‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’
এই অঞ্চলের শীতের এক অবিচ্ছেদ্য পরিচয় হ’ল খেজুর গাছের রসের নানামুখী ব্যবহার। এ অঞ্চলের রসের সুখ্যাতি সুদীর্ঘকাল ধরে, দেশজুড়ে এবং বিশ্বজুড়েও। তাই তো যশোরের ঐতিহ্যের ধারক খেজুরের রস নিয়ে প্রবাদ হয়ে যাওয়া বাক্য “যশোরের যশ, খেজুরের রস” —কথাটি গভীর তাৎপর্যবাহী। শীতের বিকেলে গাছে গাছে গাছি যখন নিপুণ হাতে গাছ কাটেন, তখন শুরু হয় এক মিষ্টি-অপেক্ষার পালা। সারা রাত হাঁড়ীতে জমা হয় এই প্রকৃতির অমৃত, যেখানে প্রতিটি ফোঁটা যেন এক রূপালী রসের খনী। ভোরের কুয়াশার মধ্য দিয়ে সেই হিমশীতল কাঁচা রস খাওয়ার স্বাদ অনন্য, আর সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরী ঝোলা গুড় আর দানাদার পাটালী ঘ্রাণে চারপাশ ম-ম করে ওঠে। এই রসে তৈরী গুড়-পাটালী ও শাক-সব্জী যশোরের শীতকালীন অর্থনীতির প্রাণ, যা বছরের পর বছর ধরে এখানকার মানুষদের জীবনযাত্রার একটি অন্যতম সহায়ক উৎস। যদিও শংকার বিষয়, এ অঞ্চলে আজ খেজুরগাছের সংখ্যা যেমন কমে এসেছে, তেমনই দক্ষ গাছির সংখ্যাও অপ্রতুল। ফলে, এই অতিমাত্রায় প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী গুড় বা পাটালী এবং তা থেকে তৈরী নানা খাদ্যসামগ্রীর ঐতিহ্য রক্ষার্থে সরকার ও সকলপক্ষের নজর দেওয়া জরুরী।
নবান্নের উৎসবের পিছে পিছে আসে শীতের পিঠা-উৎসব !
নতুন ধানের স্বাদে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে গ্রাম বাংলা, আর সেই আনন্দের সঙ্গে যোগ হয় শীতের পিঠা-পুলীর উৎসব। অগ্রহায়ণের নবান্নের পরে যখন ধান কাটা শেষ হয়, তখনই শুরু হয় পিঠা-পুলীর ধুম। এরপর শীতে খেজুরের রস, নতুন চালের গুঁড়ো, নারকেল আর গুড়ের মিষ্টি স্বাদে প্রতিটি বাড়ীর রান্নাঘর হয়ে ওঠে উৎসবের কেন্দ্র। মাটির চুলায় দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের পাশে বসে মা-চাচী বা দাদী-নানীরা চালের গুঁড়ো ও নলেন গুড় দিয়ে ভাপে তৈরী করেন ভাপা পিঠা , যার গরম ধোঁয়া ও ঘ্রাণে মন ভরে যায়। সকালে মুখে দিলে সেই পিঠা যেন অমৃতের স্বাদ এনে দেয়। তাঁরা পোড়ামাটির হাঁড়ীতে আগুনে সেঁকে চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরী করেন “কাঁচি পোড়া পিঠা”, যা গরম গরম খেতে চমৎকার। আবার, ওই পিঠা দুধ ও গুড়ের রসে ডুবিয়ে রেখে পরদিন খাওয়ার উপযোগী যখন হয তখন তা “চিতোই পিঠা”। এদিকে, চালের গুঁড়ার আবরণের ভেতর নারিকেলের ও নতুন খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরী “কুলী পিঠা”, চালের গুঁড়ো ও গুড়ের মিশ্রণে তেলে ভেজে তৈরী করা হয় “পাকান পিঠা”, আর চালের গুঁড়োর পাতলা রুটির মধ্যে নারিকেল ও গুড়ের মিশ্রণ ভরে তৈরী “পাটিসাপটা পিঠা”, চালের গুঁড়া গুলিয়ে তরল করে তা তেলে-মোছা উত্তপ্ত কড়াইয়ের উপর ছিটিয়ে ছিটিয়ে তৈরী “ছিটে রুটি”, চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরী করে শুকিয়ে গুড় ও দুধে রান্না করা হয় “সেমাই পিঠা”, খেজুরের রস বা গুড় এবং দুধ দিয়ে তৈরী ক্ষীর— সবই বাংলার গর্ব, এই উৎসবের অঙ্গ; যা কিনা যশোরাঞ্চলের মা-চাচী-দাদী-নানীরা বানান শীত-উৎসবে। এই সময়ের পিঠার ঘ্রাণ, রসের স্বাদ আর দূর-দুরান্তে থাকা পরিবারের সদস্যদের মিলন— সব মিলিয়ে শীতের এই সময় যেন এক অপূর্ব আবেগের মহাসমারোহ।
উৎসবমুখর গাঁয়ের হাট !
যশোরের শীতকালীন গ্রামীণ জীবনের প্রাণসঞ্চার হ’ল সাপ্তাহিক হাটগুলো। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে গাঁয়ের কৃষকরা সদ্য তোলা তাজা শাকসব্জী-তরিতরকারী নিয়ে হাটে উপস্থিত হন। জেলেরা নিয়ে আসেন নানাপ্রকার তাজা দেশী মাছের ঝুঁড়ি। এই টাটকা-তাজা-সুস্বাদু ও দেশী মাছ-তরিতরকারী-শাকসব্জী এবং উৎসুক মানুষের তা ঘিরে হৈ-হুল্লোড়ই হাটের বিশেষ আকর্ষণ। ওইসব হাটে খাল-বিল ও পুকুরের জ্যান্ত কৈ, মাগুর, শিং, পুঁটি, বোয়াল, রুই, কাতলা, খয়রা, খলশে, পাবদা, মায়া, মলা, ঝিয়া, চিতল, গুতেল, চিংড়ি, শোল, টাকিসহ ছোট-বড় অসংখ্য রকমের মাছের সমারোহ ঘটে। দরদামের হাঁকডাক, কুশল বিনিময় আর গাঁয়ের মানুষের হাসি-খুশী পদচারণা এই হাটগুলোতে উৎসবমুখর করে তোলে। অনেকের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ-কুশল বিনিময়ের সুযোগের কারণে এই হাটগুলো শুধু পণ্যবাজার নয়, এটি যোগাযোগের, বন্ধুত্বের, আর পারিবারিক সম্পর্কেরও অংশ।
রাতের লোকগানের মায়াবী আসর !
দীর্ঘকালের ঐতিহ্য— শীতের নির্জন রাতে যশোরের গ্রাম্য মাঠ বা বাড়ীর উঠোনে সাধারণতঃ জমে ওঠা লোকসংগীতের আসর। কবিগান-পালাগান, গাজীরগান, ভাণ্ডারীগান, জারীগান, আল্লাহ ও রাসূল প্রেমের গান, পীর-দরবেশ-ওলীআল্লাহর প্রতি প্রেমের গান, বাউলধারার গান, রাধা-কৃষ্ণের গান তথা বিভিন্ন লোকগানের সুরে পারস্পরিক ঐক্য, শান্তি ও সম্প্রীতির আবহ তৈরী করে ! কবিয়ালদের বুদ্ধিদীপ্ত কথার লড়াই, বাউলধারার গানের গায়কদের একতারার সুরে জাতিতে জাতিতে সম্প্রীতি ও সহ-অবস্থানের আহ্বান গান— সব মিলিয়ে এই রাতগুলো হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক এক পরিবেশ। তবে, দিনকে দিন সেই ধারা কমে এসেছে। এবং বর্তমানে তা আরও কম ও সীমিত পরিসরে হয়ে চলেছে। মূলতঃ এই ধরনের আসর বসা বা আয়োজনের পেছনে রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অনুকূল পরিবেশেই যা জমে উঠে থাকে। উল্লেখ্য, এক সময় বাংলার অন্য অঞ্চলের মতো এ অঞ্চলেও রাতে মোমবাতী, হারিকেন বা ল্যাম্প জ্বালিয়ে পুঁথিপাঠের আসরও বসত। যা এখন কালের বিবর্তনে ও আমাদের অবহেলায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
শেকড়ের টানে বাড়ী ফেরা !
নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের ভেতরেই সাধারণতঃ স্কুল-কলেজে বা শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা ছুটি পায়। অন্ততঃ ১৪ থেকে ১৬ বা তারও অধিক দিন থাকে ‘শীতকালীন ছুটি’। এইসব ছুটিতে অভিভাবকগণও শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে এই সময় সাধারণত গ্রামে ফিরে আসেন। সারা দেশেই এই প্রবণতা দেখা গেলেও, বিশেষ করে বৃহত্তর যশোর-খুলনা, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের লোকজনদের ভেতর এটা বেশী দেখা যায়। অর্থাৎ, মা-বাবা, দাদা-দাদী, নানা-নানীর কোলে ফিরে আসে প্রিয়জনরা। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে এই মিলনমেলায় প্রাণ ফিরে পায় পরিবারের প্রতিটি আঙিনা। শিশুদের হৈ-হুল্লোড়, বড়দের আশীর্বাদ, আর প্রবীণদের গল্প— সব মিলিয়ে এই মিলনমেলা যেন এক স্বর্গের স্বাদ। প্রভাতে সদ্য পেড়ে-আনা খেজুরের সর, এরপর সকালের মিষ্টি রোদে উঠোনে বসে মুড়ি-গুড় খাওয়া, দুপুরে হাট থেকে আনা তাজা মাছসহ নানাপদের খাবার, আর রাতের গল্পের আসর— সব মিলিয়ে এই আবেগের মুহূর্তগুলো শহরের যেকোনো বিলাসিতাকে হার মানায়।
বৃহত্তর যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া-ফরিদপুর-বাগেরহাট অঞ্চলের শীতকাল কেবল পাতা ঝরানোর সময় নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য, কৃষি, লোকসংস্কৃতি ও পারিবারিক আবেগের এক মহা মিলনমেলা। মাঠের সবুজের সৌন্দর্য, খেজুর রসের মিষ্টতা, পিঠার ঘ্রাণ, লোকগানের সুর আর শেকড়ের টানে ফিরে আসা প্রিয়জনের সান্নিধ্য— এসব মিলিয়ে এই অঞ্চল হয়ে ওঠে এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। যেন এই শীত আমাদের শিক্ষা দেয়— আধুনিকতার জোয়ারে যতই গা ভাসাই না কেন, আমাদের আসল শান্তি লুকিয়ে আছে এই সহজ-সরল গ্রামবাংলার জীবন ও মাটির টানে। এই মৌসুমে প্রতিটি প্রাণের গহীনে জেগে ওঠে এক অপূর্ব অনুভূতি— যা কিনা আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য আর প্রাচীন সংস্কৃতির অমূল্য ধন।
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবক