আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫:৪০, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১২:০১, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সন্তান লালন-পালন জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্মান। যা একই সাথে অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও চ্যালেঞ্জিং। আসলে লালন-পালন মানেই হলো প্রতিনিয়ত শেখার একটি প্রক্রিয়া। প্রতিটি পর্যায় আমাদের নতুন কিছু শেখায় এবং প্রতিটি পরিবারের অভিজ্ঞতা আলাদা হয়।
কিন্তু সত্য এটাই, আমাদের মধ্যে অনেকেই মনে করি মা-বাবা হওয়ার সাথে সাথেই আমরা সব জেনে গেছি। আমরা নিজেদের 'নিখুঁত' ভাবার একটি বাক্সে বন্দী করে ফেলি। তবে মনে রাখা জরুরি, সন্তান লালন-পালন একটি জীবনব্যাপী প্রশিক্ষণ এবং এখানে প্রতিনিয়ত শেখার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন।
সন্তান লালন-পালন সহজ নয়। আপনি যতই সতর্ক থাকুন না কেন, ভুল হওয়া স্বাভাবিক। তবে মা-বাবা এবং সন্তান— উভয়েরই শেখার সুযোগ আছে। অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পথ চলা আমাদের আরও দক্ষ করে তোলে। যদিও সন্তান লালন-পালনের কোনো সর্বজনীন নির্দেশিকা নেই, তবুও কিছু বিশেষ পদ্ধতি আমাদের সবার জন্যই উপকারী হতে পারে।
নানা অভিজ্ঞতা থেকে মা-বাবাদের করা কিছু সাধারণ ভুল এবং তা সংশোধনের উপায় নিয়ে এ আলোচনা হতে পারে। মনে রাখবেন, এগুলো কোনো কঠিন নিয়ম নয়, বরং কিছু কোমল পরামর্শ মাত্র।
সন্তান লালন-পালন আসলে কী?
সন্তান লালন-পালন হল একটি শিশুকে শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন, পথপ্রদর্শন এবং বড় করার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ। এর মধ্যে রয়েছে মানসিক সমর্থন দেওয়া, সীমানা নির্ধারণ করা, মূল্যবোধ শেখানো এবং জীবনদক্ষতা অর্জনে সাহায্য করা। এটি নিখুঁত হওয়ার লড়াই নয়, বরং সন্তানের সাথে নিজেরও বড় হওয়ার একটি যাত্রা।
সন্তান লালন-পালনে যে ১০টি ভুল আপনার এড়িয়ে চলা উচিত—
(এক) সন্তানের আবেগকে গুরুত্ব না দেওয়া : আপনি কি আপনার সন্তানকে মানসিকভাবে শক্ত করে বড় করতে চান? এ জন্য অনেক সময় আমরা বলি, "এসব নিয়ে মন খারাপ করো না," বা "তুমি তো শক্ত ছেলে, কাঁদতে নেই”। উদ্দেশ্য ভালো হলেও এটি ভুল পদ্ধতি। এতে শিশু মনে করতে পারে তার আবেগ অর্থহীন। মা-বাবা হিসেবে আমাদের কাজ হলো তাদের বোঝানো যে আবেগ থাকা স্বাভাবিক। যেমন— বজ্রপাতের সময় শিশু ভয় পেলে তাকে বলুন, "আমি বুঝতে পারছি তোমার ভয় লাগছে। কী করলে তোমার ভালো লাগবে?" এটি শিশুকে আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।
(দুই) সন্তানের কথা পাত্তা না দেওয়া : শিশুরা সবচেয়ে বেশি চায় তাদের কথা কেউ শুনুক এবং বুঝুক। ব্যস্ততার কারণে আমরা অনেক সময় তাদের ছোটখাটো বিষয়গুলো এড়িয়ে যাই। কিন্তু যখন আমরা তাদের কথা মন দিয়ে শুনি, তারা নিজেদের মূল্যবান মনে করে। পরবর্তী সময়ে আপনার সন্তান যখন কিছু বলবে, সব কাজ থামিয়ে শুনুন। এটি আপনাদের মধ্যে বিশ্বাস এবং নিরাপত্তার সম্পর্ক গড়ে তুলবে।
(তিন) অন্যের সাথে তুলনা করা : অন্যের সন্তানের সাথে নিজের সন্তানের তুলনা ঠিক নয়। অনেক মা-বাবা সামাজিক সম্মানের জন্য রেজাল্ট বা সাফল্যের তুলনা করেন— যা খুবই ক্ষতিকর বিষয়। এটি শিশুকে অনুপ্রাণিত করার বদলে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। বরং তার সমস্যাগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করুন এবং তাকে তার নিজস্ব গতিতে বাড়তে সাহায্য করুন।
(চার) অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া : সন্তানকে উপহার দেওয়া আনন্দের, কিন্তু তাদের প্রতিটি আবদার পূরণ করা তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথে বাধা হতে পারে। জীবনযুদ্ধের জন্য তাদের তৈরি করতে হলে মাঝে মাঝে "না" বলতে শিখুন। তাদের শেখান যেকোনো কিছু অর্জন করতে হলে পরিশ্রম করতে হয়। যেমন— পড়াশোনা শেষ করলে তবেই কার্টুন দেখা যাবে। এটি তাদের দায়িত্বশীল করে তুলবে।
(পাঁচ) সন্তানকে প্রহার করা : ধৈর্য হারিয়ে ফেললে অনেকে শারীরিক শাসনের পথ বেছে নেন। কিন্তু অতিরিক্ত ও অসতর্ক মারধর বা বকাঝকা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করে থাকে। এতে শিশুর মনে ভয়ের সৃষ্টি হয় এবং সে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। শাসনের ক্ষেত্রে মারধরের বদলে ইতিবাচক কথা এবং সঠিক যোগাযোগ ব্যবহার করুন।
’
(ছয়) সন্তানের সামনে ঝগড়া করা : পারিবারিক মতভেদ স্বাভাবিক, কিন্তু সন্তানের সামনে চিৎকার বা ঝগড়া করা তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ বা বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে। কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলে তা একান্ত ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করুন। সন্তানের সামনে সবসময় গঠনমূলক আচরণের উদাহরণ তৈরি করুন।
(সাত) সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া : অনেকে সন্তানের আগ্রহ, সক্ষমতা ও উৎসাহ কোন দিকে সেটা লক্ষ্য নিজের মতো করে অনেক বিষয় চাপিয়ে দিয়ে থাকেন। এটি সন্তানের নিজস্ব প্রতিভা বিকাশে বাধা দেয়। প্রতিটি শিশু আলাদা এবং তার নিজস্ব সম্ভাবনা রয়েছে। মা-বাবা হিসেবে আপনার কাজ হলো তার ইতিবাচক দক্ষতা-সক্ষমতা ও উৎসাহকে চিহ্নিত করে সে পথে তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা।
(আট) সন্তানকে সব সময় ব্যস্ত রাখা : অনেকে মনে করেন শিশুকে সারাক্ষণ টিভি, গেম বা কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত রাখা জরুরি। কিন্তু মাঝেমধ্যে শিশুদের 'বোর' হতে দেওয়াও প্রয়োজন। যখন তারা অলস সময় কাটায়, তখন তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা এবং নিজে নিজে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা তৈরি হয়। অতিরিক্ত ব্যস্ত রুটিন তাদের মধ্যে মানসিক চাপের সৃষ্টি করতে পারে।
(নয়) সঠিক সীমানা নির্ধারণ না করা : সন্তানকে স্বাধীনতা দিন, কিন্তু পরিবারের নিয়ম বা সীমানা স্পষ্ট রাখুন। যেমন— ঘুমানোর সময় নির্দিষ্ট থাকলে তা প্রতিদিন মেনে চলতে হবে। নিয়মের বিষয়ে বার বার আপস করলে আপনার কর্তৃত্ব কমে যায় এবং শিশু বিভ্রান্ত হয়। নিয়মানুবর্তিতা শিশুকে দায়িত্বশীল হতে শেখায়।
(দশ) ভালবাসা ও মমতা প্রকাশ না করা : শুধু ভরণপোষণই যথেষ্ট নয়, শিশুকে শারীরিকভাবে ভালবাসা জানানোও জরুরি। তাদের জড়িয়ে ধরা, আদর করা বা হাত ধরার মতো ছোট কাজগুলো আপনাদের বন্ধন শক্ত করে। সন্তানের পছন্দের কাজে সময় দিন (যেমন—একসাথে ছবি আঁকা বা খেলাধুলা)। ভালোবাসা ও নিয়ম— এই দুটির সমন্বয়ই হলো আদর্শ সন্তান লালন-পালন।
ভালো মা-বাবা হতে হলে অবশ্যই ভুলগুলো থেকে শিখতে হবে, শুধরাতে হবে। সন্তানের জন্য নিজের সামর্থ্যের ভেতর পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি একটি ভালবাসাময় পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ধৈর্য ও যত্নের মাধ্যমে আপনি আপনার সন্তানের সাথে এমন একটি বন্ধন তৈরি করতে পারেন যা আজীবন অটুট থাকবে। সূত্র : একটি বিদেশী ম্যাগাজিন অবলম্বনে।