পহেলা বৈশাখ : বাঙালীর রসনাবিলাসে ঐতিহ্যের ছোঁয়া

আহমাদ ফেরদৌস

প্রকাশ: ০৪:৩৯, ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ০৫:৫৩, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

পহেলা বৈশাখ : বাঙালীর রসনাবিলাসে ঐতিহ্যের ছোঁয়া

বাঙালীর পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন হালখাতা, রং-বেরঙের পোশাক আর জিভে জল আনা সব দেশী খাবারের সমারোহ। যান্ত্রিক এই যুগেও বৈশাখের এই দিনটিতে আমরা ফিরে যাই মাটির কাছাকাছি, আমাদের শেকড়ের টানে।

নিচে পহেলা বৈশাখে বাঙালীর উৎসবের খাবার নিয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো—

পান্তা ভাত-ইলিশ ভাজা
নববর্ষের ভোরের প্রধান আকর্ষণই হলো পান্তা ভাত। মাটির সানকিতে ভেজানো ভাত, সাথে এক টুকরো মচমচে ইলিশ ভাজা। অনুষঙ্গ : সাথে থাকে সর্ষের তেল, কাঁচা পেঁয়াজ এবং পোড়া শুকনো লঙ্কা। ঐতিহ্য : এটি মূলত গ্রামীণ কৃষকের খাবার হলেও এখন তা আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

ভর্তার বিশাল সাম্রাজ্য
বাঙালীর রান্নায় ভর্তা মানেই এক বিশেষ শিল্প। বৈশাখের ভোরে ভাতের সাথে ১৬ থেকে ২০ পদের ভর্তা সাজানো হয়। আমিষ ভর্তা : চ্যাপা শুঁটকি, শোল-চ্যাং ভর্তা, লোট্টা শুঁটকি কিংবা চিংড়ি মাছের ঝাল ভর্তা। নিরামিষ ভর্তা : আলু, বেগুন, পটল, কুমড়ো, কচু শাক, ডাল ভর্তা। ঔষধী গুণসম্পন্ন : কালো জিরা ও ধনেপাতা ভর্তা, যা স্বাদের পাশাপাশি শরীরের জন্যও উপকারী।

দুপুরের রাজকীয় ভোজ
সকালের হালকা খাবারের পর দুপুরে থাকে উৎসবের আমেজ। শাক-সবজি : সজনে ডাঁটা দিয়ে চচ্চড়ি কিংবা লাউ-চিংড়ির মতো মৌসুমি সবজি। মাংসের পদ : ভুনা খিচুড়ির সাথে কষা গরুর মাংস কিংবা দেশী মুরগির আলু দিয়ে ঝোল। ডাল : ঘন মুগ ডাল কিংবা মাছের মাথা দিয়ে মুড়িঘণ্ট।

টক-মিষ্টির স্বাদবদল
বৈশাখের কড়া রোদে শরীর ও মন চনমনে রাখতে খাবারের শেষে টক বা চাটনীর বিশেষ গুরুত্ব আছে। কাঁচা আমের চাটনি : বৈশাখ মানেই কাঁচা আমের মৌসুম। সরিষা বা পাঁচফোড়ন দিয়ে তৈরি আমের টক খাবারের তৃপ্তি বাড়িয়ে দেয়। ফলহার : তরমুজ, বেল ও কাঁচা আমের শরবত ডিহাইড্রেশন দূর করতে সাহায্য করে।

মেলার নাস্তা ও শুকনা মিষ্টি
পহেলা বৈশাখের বিকাল মানেই মেলা। আর মেলার খাবারের স্বাদ ঘরে বানানো খাবারের চেয়ে ভিন্ন। খাজা ও গজা : ময়দা ও চিনির সিরায় তৈরি মচমচে সব খাবার। কদমা ও বাতাসা : নকশা করা চিনির খেলনা বা গোল গোল বাতাসা শিশুদের প্রধান আকর্ষণ। মুড়ি-মুড়কী : গুড় দিয়ে মাখানো মুড়কি ও খই যা বিকেলের আড্ডায় অপরিহার্য।

পিঠা-পুলীর অকাল-বোধন
সাধারণত পিঠা শীতকালের হলেও বৈশাখের উৎসবে অনেক অঞ্চলে পিঠার আয়োজন থাকে। ভাপা ও পাটিসাপটা : নতুন গুড় না থাকলেও চিনি বা নলেন গুড় দিয়ে তৈরি পিঠা। পিঠা উৎসব : নকশী পিঠা বা তেলের পিঠা মেলার দোকানগুলোতে সাবেকীভাব বজায় রাখে।

হালখাতার মিষ্টিমুখ
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নতুন খাতা খোলার এই দিনে ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো এক প্রাচীন রীতি। সন্দেশ ও রসগোল্লা : ছানার তৈরি খাঁটি দেশী মিষ্টি। নিমকী : মিষ্টির আধিক্য কমাতে লোনা স্বাদের মুচমুচে নিমকী।

পহেলা বৈশাখের এই খাবারের আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা মাছে-ভাতে বাঙালী। এটি কেবল একদিনের উৎসব নয়, বরং আমাদের হারানো ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি বার্ষিক শপথ। শুভ নববর্ষ ১৪৩৩! আপনার বর্ষবরণ উৎসব আনন্দময় হোক।

Sara

আরও পড়ুন