​​​​​​​না.গঞ্জের গার্মেন্ট শিল্পে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও জনদুর্ভোগ

নিউজ ডেক্স

প্রকাশ: ১৮:৫৪, ২৫ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৮:৫৪, ২৫ জুলাই ২০২৬

​​​​​​​না.গঞ্জের গার্মেন্ট শিল্পে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও জনদুর্ভোগ

ছবি সংগৃহীত

একদিকে শিল্পকারখানার বয়লার নিভে যাচ্ছে, অন্যদিকে সড়কে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার দীর্ঘ হচ্ছে সিএনজিচালিত যানবাহনের সারি। গ্যাসের তীব্র সংকট এখন শুধু শিল্পাঞ্চল নয়, পুরো নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতি ও জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লেগেছে দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জে। অনেক ক্ষেত্রে ডাইং কারখানায় কাপড় নষ্ট হচ্ছে, ফলে রপ্তানি চালান (শিপমেন্ট) ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় ইতোমধ্যে জেলার ছোট-বড় শতাধিক গার্মেন্টস ও নিট কারখানা উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত করেছে । শিল্পমালিকদের দাবি, গ্যাসের সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় ১৫-২০ শতাংশে নেমে এসেছে। তিতাস সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতে প্রতি মাসে গ্যাসের চাহিদা ৯০-৯৫ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ একেবারে কম। একই সঙ্গে গ্যাসের অভাবে কমপক্ষে ৬০টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন কার্যত বন্ধ থাকায় পরিবহন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে কাঁচাবাজারেও। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের নিটওয়্যার শিল্পের প্রাণকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ। এখানকার উৎপাদন ব্যাহত হলে জাতীয় রপ্তানি আয়ও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, প্রতি বছর নারায়ণগঞ্জভিত্তিক নিটওয়্যার ও সংশ্লিষ্ট পোশাকশিল্প থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হয়। এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু চলমান গ্যাস সংকট সেই ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে।

ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ ও আড়াইহাজারের শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, অনেক কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক নেই। কোথাও একটি শিফট চলছে, কোথাও আবার বয়লার চালু করা যাচ্ছে না বলে উৎপাদন কয়েক ঘণ্টা পরপর বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিশেষ করে ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং ইউনিটগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

একাধিক কারখানার কর্মকর্তারা জানান, দিনে কয়েক ঘণ্টা গ্যাস এলেও চাপ এত কম যে তা দিয়ে বয়লার চালানো সম্ভব হয় না। অনেক সময় রাতভর অপেক্ষা করেও উৎপাদন শুরু করা যায় না। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

একজন উদ্যোক্তা বলেন, বিদেশি ক্রেতা সময় দেখে, অজুহাত নয়। গ্যাস না থাকলেও নির্ধারিত তারিখে পণ্য পৌঁছাতে না পারলে জরিমানা দিতে হয়, আবার পরের অর্ডারও হারানোর আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নারায়ণগঞ্জ দেশের নিটশিল্পের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। এখানে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব সরাসরি জাতীয় রপ্তানিতে পড়ে।

তিনি বলেন, গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক কারখানা অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমে যাবে। বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন।

তিনি আরও বলেন, শিল্পাঞ্চলে অন্তত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য আলাদা গ্যাস ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলারও দাবি জানান তিনি।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁ এলাকায় গড়ে উঠেছে হাজারেরও বেশি গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানা। এসব শিল্পকারখানার অধিকাংশই গ্যাসনির্ভর। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে অনেক এলাকায় গ্যাসচাপ এতটাই কম যে, বয়লার চালানো যাচ্ছে না। ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং ইউনিটগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

শিল্প মালিকরা জানান, দিনে কয়েক ঘণ্টা গ্যাস এলেও চাপ এত কম থাকে যে, তা দিয়ে কোনো যন্ত্র সচল রাখা সম্ভব হয় না। ফলে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন অর্ডার বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন অর্ডার পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।

ফতুল্লার একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপক বলেন, আগে যেখানে ২৪ ঘণ্টা উৎপাদন চলত, এখন অনেক সময় এক শিফটও পুরোপুরি চালানো যায় না। গ্যাস না থাকায় বয়লার বন্ধ থাকে, ফলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াই থেমে যায়।

সিদ্ধিরগঞ্জের এক নিট পোশাক প্রস্তুতকারক জানান, প্রতিদিন নির্ধারিত উৎপাদনের প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ কম হচ্ছে। সময়মতো রপ্তানি না করতে পারলে বিদেশি ক্রেতারা জরিমানা করছেন। এতে উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিও বাড়ছে।

শিল্প মালিকদের সংগঠনের নেতারা বলছেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবে সংকট সামাল দিতে পারলেও সীমিত মূলধনের অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার শতাধিক গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরী, পঞ্চবটি, কুতুবপুর, কাঁচপুর এবং রূপগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক কারখানায় উৎপাদন লাইন বন্ধ। কোথাও শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন, আবার কোথাও আংশিক উৎপাদন চলছে। কয়েকটি কারখানার সামনে শ্রমিকদের জটলা দেখা গেছে। তাদের অভিযোগ, কাজ না থাকায় ওভারটাইম বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকের বেতনও বিলম্বে দেওয়া হচ্ছে।

শিল্পমালিকদের সংগঠনের নেতারা জানান, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা লোকসান গুনছে। ফলে ইতোমধ্যে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা উৎপাদন স্থগিত রেখেছে।

কারখানা বন্ধ হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে ওভারটাইম বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও শ্রমিকদের পালাক্রমে কাজে ডাকা হচ্ছে। এতে তাদের মাসিক আয়ও কমে গেছে।

গ্যাস সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, জেলার কমপক্ষে ৬০টি সিএনজি স্টেশন পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় কার্যত বন্ধ রয়েছে। যেগুলো চালু আছে, সেখানেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া, ফতুল্লা, কাঁচপুর ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন স্টেশনে দেখা যায়, শত শত সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক চালক তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস নিতে পারছেন না।

একজন সিএনজি অটোরিকশাচালক বলেন, গ্যাস না পেয়ে অর্ধেক সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। যাত্রী পরিবহনের সময়ই থাকে না। আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পণ্য পরিবহনে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জেলার বিভিন্ন কাঁচাবাজারে সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে।

চাষাঢ়া, কালীরবাজার, দেওভোগ, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের বাজারগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ সবজির দাম ১০০ টাকার নিচে নেই। কাঁচামরিচ, শিম, করলা, বরবটি, ফুলকপি, লাউসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, আবার অনেক ট্রাক ও পিকআপ সময়মতো মাল আনতে পারছে না। ফলে সরবরাহও কমে যাচ্ছে।

গ্যাস সংকটে শুধু শিল্প ও ব্যবসা নয়, সাধারণ মানুষও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের চাপ কম থাকায় সকাল ও সন্ধ্যায় রান্না করতে সমস্যায় পড়ছেন অনেক পরিবার। আবার সিএনজি সংকটের কারণে গণপরিবহনের ওপর চাপ বেড়েছে। অফিসগামী মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

নগরীর এক বাসিন্দা বলেন, বাসায় গ্যাস নেই, বাইরে গেলে যানবাহনের সংকট। সবকিছুর দাম বাড়ছে। সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের তৈরি পোশাক ও নিটশিল্প বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস। নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকলে উৎপাদন কমবে, রপ্তানি কমবে এবং কর্মসংস্থানও সংকুচিত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে বাংলাদেশ। উৎপাদন ব্যাহত হলে বিদেশি ক্রেতারা সহজেই অন্য দেশে অর্ডার স্থানান্তর করতে পারেন। একবার অর্ডার চলে গেলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন।

শিল্পমালিক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা—সব পক্ষই বলছেন, এই সংকট আর সাময়িক সমস্যা নয়; এটি এখন অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। তারা শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ, এলএনজি আমদানি ও বিতরণব্যবস্থা উন্নয়ন, পাইপলাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

তাদের মতে, নারায়ণগঞ্জ দেশের শিল্প অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই শিল্পাঞ্চলকে সচল রাখতে না পারলে শুধু একটি জেলার নয়, পুরো দেশের রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই গ্যাস সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

Sara

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন