অচল ১০০ সিসিটিভি ক্যামেরা নজরদারির বাইরে সিরাজগঞ্জ শহর

নিউজ ডেক্স

প্রকাশ: ১৭:৪০, ৯ জুলাই ২০২৬

অচল ১০০ সিসিটিভি ক্যামেরা নজরদারির বাইরে সিরাজগঞ্জ শহর

ছবি সংগৃহীত

নিরাপদ শহর গড়ার লক্ষ্য নিয়ে চার বছর আগে সিরাজগঞ্জ শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে স্থাপন করা হয়েছিল ১০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন সেই প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ ক্যামেরা বিকল, আবার কিছু ক্যামেরা চুরি হয়ে গেছে। ফলে শহরের বড় একটি অংশ কার্যত নজরদারির বাইরে চলে গেছে।
 

স্থানীয়দের অভিযোগ, সিসিটিভি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় চুরি, ছিনতাই, মোটরসাইকেল চুরি, ইভটিজিং, কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকি বেড়েছে। অপরাধ সংঘটিত হলেও অনেক সময় ঘটনাস্থলের কোনো ভিডিও প্রমাণ না থাকায় অপরাধীদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
যমুনা নদীর তীরবর্তী বাণিজ্যিক শহর সিরাজগঞ্জে প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজারো মানুষ নানা কাজে আসা-যাওয়া করেন। প্রায় দুই লাখ মানুষের এই শহরের নিরাপত্তা জোরদারে ২০২১ সালে জেলা পুলিশের উদ্যোগে ৬৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১০০টি উচ্চ ক্ষমতাসম্কন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়।
স্থাপনের পর এসব ক্যামেরার ফুটেজ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মনিটরিং সেল থেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হতো। এতে অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি ঘটনার পর দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করতেও সহায়তা পাওয়া যেত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই ব্যবস্থায় ভাটা পড়ে। বর্তমানে অধিকাংশ ক্যামেরা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কিছু ক্যামেরা আবার চুরি হয়ে গেছে।
ক্যামেরা না থাকায় অপরাধীরা বেপরোয়া বলে শহরের দরগা রোড এলাকার বাসিন্দা হাসান তালুকদার বলেন, সরকারি সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর বেশির ভাগই এখন অচল। অপরাধীরা বুঝতে পারছে তাদের কর্মকাণ্ড আর রেকর্ড হচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
মুড়িপট্টি এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, ক্যামেরা সচল থাকলে অপরাধীরা ভয় পেত। এটিএম বুথ থেকে টাকা নিয়ে বের হওয়ার সময় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেল চুরিও বাড়ছে। ক্যামেরা থাকলে পুলিশ দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারত।
বাজার স্টেশন এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, আগে বিভিন্ন মোড়ে ক্যামেরা দেখে স্বস্তি পাওয়া যেত। এখন বেশির ভাগ ক্যামেরাই নষ্ট। কোনো ঘটনা ঘটলে অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অভিভাবকরা। রোকসানা খাতুন বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে সচল ক্যামেরা থাকলে ইভটিজিংসহ অনেক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।
রিকশাচালক সুজাব আলী বলেন, রাতে যাত্রী নিয়ে চলাচল করতে ভয় লাগে। কোথাও ছিনতাই বা মারামারি হলে পরে প্রমাণ পাওয়া যায় না। ক্যামেরা সচল থাকলে অপরাধীরা অন্তত সতর্ক থাকত।
স্থানীয়দের দাবি, সিসিটিভি ব্যবস্থা অচল হওয়ার পর শহরে ছোট-বড় চুরি, ছিনতাই ও মোটরসাইকেল চুরির মতো অপরাধ বেড়েছে। কয়েক মাস আগে শহরের চৌরাস্তা এলাকায় দিনের আলোয় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও শহরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সিরাজগঞ্জ বড় বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্কাদক শফিকুল ইসলাম জিন্না বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরা অপরাধ দমন ও ব্যবসায়ী-সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক ক্যামেরা অচল থাকায় নজরদারি দুর্বল হয়েছে। দ্রুত অচল ক্যামেরা মেরামত, প্রয়োজনীয় স্থানে নতুন ক্যামেরা স্থাপন এবং নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এ উদ্যোগে ব্যবসায়ী সমাজ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্কাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা ক্যামেরাগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। জেলা পুলিশ ও পৌরসভা যৌথভাবে আবার পুরো শহরকে সিসিটিভির আওতায় আনলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে।
সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সিসিটিভি ক্যামেরার গুরুত্ব অনেক। নতুন করে শহরের ১১৮টি পয়েন্টে ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পৌরসভার বাজেট পাওয়া গেলে কাজ শুরু করা হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্কদ ব্যবস্থাপনা) এবং সিরাজগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা শাহাদাত হুসেইন বলেন, জেলা পুলিশের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পৌরসভার পক্ষে সব ক্যামেরার ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে দ্রুত সিসিটিভি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থাপন করা কোটি টাকার সিসিটিভি নেটওয়ার্ক এখন কেন অচল এ প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে শহরবাসীর মনে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নষ্ট হওয়ার দায় নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। নতুন করে ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে সিরাজগঞ্জবাসীর দাবি একটাই শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, তারা চান সচল ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

Sara

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন