হাসান শিরাজী
প্রকাশ: ২০:৫২, ২০ জুলাই ২০২৬
ছবি এআই
রহিম সাহেব (ছদ্মনাম) গত দশ বছর ধরে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। তিনি ক্লাসে যান, বইয়ের রিডিং পড়েন, বাচ্চাদের মুখস্থ করতে বলেন আর ধমক দিয়ে ক্লাস শান্ত রাখেন। এর বাইরে আধুনিক পদ্ধতিতে কীভাবে পড়াতে হয়, কীভাবে বাচ্চাদের মনে আগ্রহ তৈরি করতে হয়—তার কিছুই তিনি জানেন না। কারণ, চাকরিতে ঢোকার পর তিনি যে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন, তা ছিল কেবলই নামমাত্র। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, যিনি তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, তিনি নিজেই জানতেন না আধুনিক শিক্ষাদানের বিশ্বমানের কৌশলগুলো কী।
রহিম সাহেবের গল্পটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সারা দেশের লাখ লাখ শিক্ষকের গল্প এটি। আমরা সবাই চাই আমাদের সন্তানরা স্কুলে গিয়ে আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক আর আনন্দদায়ক পরিবেশে শিক্ষা লাভ করুক। কিন্তু যারা এই শিক্ষকদের তৈরি করবেন, সেই ‘শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ’ (টিটিসি) বা ‘প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’ (পিটিআই)-গুলোর ভেতরের অবস্থা জানলে আপনি রীতিমতো চমকে উঠবেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, শিক্ষকদের যারা প্রশিক্ষণ দেন, সেই প্রশিক্ষকদের নিজেদেরই পেশাগত মানের কোনো নিশ্চয়তা নেই। কেন এমন হলো? চলুন একটু ভেতরের খবরগুলো জেনে নিই। কোনো একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড শক্ত করতে হলে আগে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করতে হয়। অথচ আমাদের দেশে চিত্রটা ঠিক উল্টো। উপজেলা রিসোর্স সেন্টার (ইউআরসি) বা পিটিআইগুলোর জনবল সংকটের দিকে তাকালে যে কারও চোখ কপালে উঠবে।
তথ্য বলছে, দেশে ইউআরসিতে সহকারী ইনস্ট্রাক্টরের ৫০৫টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১৮ জন, অর্থাৎ ৪৮৭টি পদই খালি পড়ে আছে! অন্যদিকে পিটিআইগুলোতে সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট পদের অর্ধেকের বেশি খালি, এবং ইনস্ট্রাক্টর (সাধারণ) পদে ৭৯৪টির মধ্যে ৩৭০টি পদই শূন্য। ভাবুন তো, যে প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষকই নেই, সেখানে প্রশিক্ষণ হচ্ছে কীভাবে? ভেতরের খবর হলো, একজন ইনস্ট্রাক্টরকে দুই থেকে তিনটি জেলার দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এই প্রচণ্ড কাজের চাপে একজন প্রশিক্ষকের পক্ষে কি মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব? মোটেও না। ফলে যা হচ্ছে—শিক্ষকরা শুধু হাজিরা খাতায় সই করে আর একটি সনদ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন, ক্লাসরুমের বাস্তবতায় এর কোনো প্রয়োগ নেই।
একজন ভালো শিক্ষক হতে গেলে শুধু নিজের বিষয়টি জানলেই হয় না, কীভাবে শেখাতে হবে সেই মনস্তাত্ত্বিক ও আধুনিক পদ্ধতিও জানতে হয়। বিশ্বজুড়ে এখন ‘ট্রেইন দ্য ট্রেইনার’ বা প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোতে যারা পড়াচ্ছেন, তাদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে পুরনো ধ্যান-ধারণা আর ‘চক-ডাস্টার’ মডেলেই আটকে আছেন। তাদের নিজেদের জন্য উন্নত বিশ্বের আধুনিক পেডাগজি (শিক্ষাদান বিদ্যা), প্রযুক্তিনির্ভর লার্নিং বা শিশু মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণার কোনো সুযোগ বা বাধ্যবাধকতা নেই। যুগের পর যুগ ধরে একই সিলেবাসে, অনেকটা দায়সারাভাবে লেকচার দিয়ে যাচ্ছেন তারা। ফলে নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের তারা এমন কিছু শেখাতে পারছেন না, যা দিয়ে শ্রেণিকক্ষে বাচ্চাদের মনোযোগ ধরে রাখা যায়।
শিক্ষার এই সংকট কাটাতে হলে গোড়ায় গলদ রেখে শুধু কারিকুলাম বা পাঠ্যবই বদলালে কোনো কাজ হবে না। নীতিনির্ধারকদের এখনই কিছু বাস্তবসম্মত ও জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। টিটিসি-কে ‘জাতীয় ট্রেনিং হাব’-এ রূপান্তর করা: শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোকে শুধু সনদ বিতরণের কারখানা করে রাখলে চলবে না। এগুলোকে আধুনিক ‘ট্রেনিং হাব’ বা গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একজন শিক্ষক শুধু প্রশিক্ষণ নিয়ে চলে যাবেন না, বরং প্রশিক্ষণ শেষে তিনি শ্রেণিকক্ষে কতটা কাজে লাগাতে পারছেন, সেই ফলোআপ বা মনিটরিং করার দায়িত্বও এই হাবের অধীনে থাকতে হবে।
ইউআরসি এবং পিটিআইগুলোতে থাকা শত শত শূন্যপদ অবিলম্বে পূরণ করতে হবে। তবে যেনতেন লোক দিয়ে নয়; যারা সত্যিকার অর্থেই শিক্ষাদান কৌশল নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, তাদেরই প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। প্রশিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ (‘ট্রেইন দ্য ট্রেইনার’): যারা শিক্ষকদের শেখাবেন, তাদের পেশাগত মান উন্নয়নের জন্য নিয়মিত আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল লার্নিং এবং ক্লাসরুম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে তাদের দক্ষ হতে হবে। বাস্তবধর্মী ও সময়োপযোগী কারিকুলাম প্রণয়ন: শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মডিউল বা সিলেবাস কোনোভাবেই পুরনো যুগের হলে চলবে না। শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এমন একটি সিলেবাস তৈরি করতে হবে, যা শিক্ষকদের শেখাবে কীভাবে মুখস্থ বিদ্যার বদলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও চিন্তার জায়গা তৈরি করা যায়।
শিক্ষকদের মান নিয়ে আমরা সবসময় অভিযোগ করি। কিন্তু একটিবার ভেবে দেখুন, যে কারখানায় এই শিক্ষকদের তৈরি করা হচ্ছে, সেই কারখানার যন্ত্রপাতিই যদি জং ধরা থাকে, তবে ভালো পণ্য বের হবে কীভাবে? শিক্ষকদের দোষ দেওয়ার আগে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে, শিক্ষকদের গুরুরা যেন বিশ্বমানের হন। কারণ, আজকের শ্রেণিকক্ষের মানের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।